উদ্বেগ-আতঙ্কে কেমন কাটছে গ্রামের ঈদ?

বিজ্ঞাপন

ঈদ মানেই তো আনন্দের জেগে ওঠা গ্রাম। প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার নানা গঞ্জনা, অভাব, অনটন, ভৌগোলিক দূরত্ব আর মানসিক অনৈক্যের বাতাবরণ ঝেড়ে ফেলে বাংলার গ্রামগুলোতে আনন্দে মাতেন মানুষ। কিন্তু কত শত বছর পর গ্রামের সেই আনন্দ-উচ্ছ্বাস ফিকে হয়ে গেল!মহা আনন্দের ঈদে এমন উদ্বেগ আর আতঙ্ক হয়তো মানুষ ভাবতেই পারেনি।

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসে লাখে লাখে মানুষ মারা যাচ্ছেন । প্রতিনিয়ত লাফিয়ে এই মৃত্যু মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে আমাদের দেশেও। আক্রান্ত ও মৃত্যু সংখ্যায় চরম দুঃসময় পার করছে দেশ। স্বজন হারানোর বেদনা কিংবা স্বজন হারানোর ভয়ে পুরো দেশ কাতর হয়ে আছে। প্রিয়জনকে এই মহামারি থেকে রক্ষা করতে মানুষের এমন হাজারটা ঈদের আনন্দ বিসর্জন দেয়া যেন কোনো ব্যাপার না। আর সে কারণে শত বছরের চির চেনা গ্রামের ঈদের দৃশ্য এবারে ভিন্ন।

ঈদে শহর ছেড়ে অনেকে শৈশবের স্মৃতিঋদ্ধ জনপদে ফিরলেও ঈদের আমেজ নেই গ্রামে। সবখানে এক অদৃশ্য ভয়। করোনার ভয়, সংক্রমণের ভয়, মৃত্যুর ভয়। বরং শহর থেকে গ্রামে ফেরা মানুষগুলোই যেন বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশব্যাপী যখন করোনাভাইরাস নামক বিশ্বমহামারিতে লণ্ডভণ্ড তখন ঈদের আনন্দ কার মনে জাগতে পারে? তবুও মানুষ প্রিয়জনের মুখচেয়ে তার কাছে যেতে চেয়েছিলেন। দেশব্যাপী অপরিপক্ব লকডাউনে নানা বিড়ম্বনা পেরিয়ে গ্রামে পৌঁছালেও বেশিরভাগ মানুষকে হোম কোয়ারাইন্টাইন পালন করতে হচ্ছে। ঈদে দীর্ঘদিন পর আত্মীয়কে পেয়ে বুকে জড়িয়ে নেয়ার সুযোগ হলেও এবার তাও হচ্ছে না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হচ্ছে তাদের। তারা কাছে যেতে চাইলেও আতঙ্কিত মানুষ দূরত্ব মানছেন।

এদিকে সরকারি বিভিন্ন নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিধির কারণে ঈদের নামাজ ঈদগাহ কিংবা মুক্ত প্রান্তরে পড়ার সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবিধি মেনে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়তে বলা হয়েছে। যার কারণে হাজার বছরের ঐতিহ্য ঈদের নামাজ এবার বিচ্ছিন্নভাবে পড়তে হয়েছে মানুষকে। ঈদের সর্বপ্রথম রেওয়াজ হচ্ছে কোলাকুলি করা কিন্তু এবার তাতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

অনেককে স্বাস্থ্যবিধি না মানতে দেখা গেছে। ছবি: সংবাদ২৪

নড়াইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মৌলভীবাজারের গ্রামগুলোতে দেখা যায়- করোনা পরিস্থিতিতে ঈদে সরকারের বিভিন্ন নির্দেশনা থাকলেও তা মানছেন না মানুষ। সোশ্যাল ডিসটেন্সে ঈদের নামাজ আদায় করা হলেও অনেকেকেই কোলাকুলি ও কর্মদন করতে দেখা গেছে। শিশুদের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা গেছে। তবে বেশিরভাগ মসজিদে অন্যান্যে ঈদের তুলনায় কয়েকগুণ কম মানুষ উপস্থিত হয়েছেন।

ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরেছেন মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মোহাম্মদনগরের আনুয়ার হায়দার। তিনি সংবাদ২৪-কে বলেন- অনেক ঝামেলা করে ঢাকা থেকে গ্রামে এসেছি। কোনো ঈদ আমি পরিবারের থেকে আলাদা কাটাইনি। এবারও মা-বাবর সাথে সময় কাটবে। তবে অন্যবারের ঈদের আনন্দ এখানে নেই। ১৬ দিন কোয়ারেন্টাইন পালন করে বের হয়েছি কিন্তু আমি কারো সাথে মিশতে পারছি না কারণ আমাকে মানুষ ভয় পাচ্ছে আবার আমি অন্যকে ভয় পাচ্ছি।

একই উপজেলার গ্রামতলা গ্রামের প্রবীণ সফর আলী বলেন- করোনাকে আমি শুরু থেকে ভয় পাইনি। এখনও কোনো ভয় নাই। আমি অনেকের সাথে কোলাকুলি করলাম এখানে। নামাজ পড়লাম সবার সাথে। সব আল্লার ইচ্ছে, উনার হুকুম ছাড়া কারো কিছু হয় না।

ঈদ আসলে গ্রামের কিশোর কিশোরীদের মধ্যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আসে। কিন্তু এবারে সেও নেই বললে চলে। করোনা পরিস্থিতিতে খাদ্য সংকটে আছে দেশের মানুষ। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন কোটি মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে ঈদের আনন্দ মানুষকে ধরা দেয়নি।

ঈদের বন্ধুদের সাথে নিয়ে ঘুরাঘুরি কিংবা বন্ধু-আত্মীয়দের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ নেই। জামাই তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি, রান্না করা বাহারি খাবার নিয়ে মেয়ের বাড়ি আসেন বাবা। বাড়িতে বসে মা তার বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনকে নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে ঈদ উদযাপন হয়ে থাকেন। চলমান লকডাইনে বন্ধ রয়েছে গণ পরিবহণ, সোশ্যাল গেদারিংয়ে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। যার কারণে গ্রামীণ মানুষের কাছে এই ঈদ একটি স্বাভাবিক দিনের সমান।

এমন বিপর্যয়ের মধ্যে পৃথিবী আবার শান্ত হবে। মানুষ মানুষকে বুকে জড়িয়ে ধরতে আর কোনো ভয় পাবে না। মহামারিসব মানুষের কাছে পরাজিত হবে। পৃথিবী বাঁচলে আবার মানুষ উৎসবে মাতবে। সেদিনই হয়তো এমন একটি ঈদের আনন্দকে ম্লান করে দিবে মানবজাতির সে জয়।

#সংবাদ২৪/এমকে

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status