ঋতুপর্ণ ঘোষ: মানবিক পৃথিবীর দাবি ছিল যার

বিজ্ঞাপন

১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট কোলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন ঋতুপর্ণ ঘোষ নামের একজন মানুষ। হ্যাঁ,শুধুই মানুষ। সেই মানুষটার আজ প্রয়াণ দিবস।

তিনি ছিলেন একজন বাঙ্গালি চলচ্চিত্র পরিচালক এবং অভিনয় শিল্পী। বাঙ্গালি চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত,সমালোচিত,বিতর্কিত এবং জনপ্রিয়দের একজন। উচ্চ শিক্ষিত, নম্র, ভদ্র এবং শিশুসুলভ প্রাণোচ্ছল স্বভাবের একজন অসাধারণ মানব সন্তান।

তাঁকে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আলোচিত,সমালোচিত এবং বিতর্কের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে সেটি তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন- তিনি একজন সমকামী। যা ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে বিরল ঘটনা। উপমহাদেশে নিজের সমকামিতার কথা বলতে সাধারণ মানুষেরও বুক কাঁপে,আর সে তো ঋতুপর্ণ ঘোষ!

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র ঋতুপর্ণ ঘোষ কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একটি বিজ্ঞাপন সংস্থার ক্রিয়েটিভ আর্টিস্ট হিসেবে। তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘হিরের আংটি’ মুক্তি পায় ১৯৯২ সালে। দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘উনিশে এপ্রিল’ মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে। এই চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ কাহিনীচিত্র বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

তারপর একে একে ‘শুভ মহরত’ (২০০৩), ‘রেইনকোট’ (২০০৪), ‘অন্দরমহল’ (২০০৫), ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’ (২০০৭), ‘খেলা’ (২০০৮), ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ (২০০৮), ‘আবহমান’ (২০০৯), ‘নৌকাডুবি’ (২০১০), ‘মেমোরিজ ইন মার্চ'(২০১১), ‘চিত্রাঙ্গদা’ (২০১২), ‘জীবনস্মৃতি’ (২০১২) চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমে নিজেকে কিংবদন্তি পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন সত্যজিৎ রায় অনুরাগী এই মানুষটি।

এই চলচ্চিত্রগুলো ঋতুপর্ণ ঘোষকে এনে দিয়েছে ১২টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এছাড়াও বার্লিন, লোকার্নো, শিকাগো, বোম্বে, বুসান প্রভৃতি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেছেন এই গুণী নির্মাতা।

তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি অভিনয়েও পারদর্শিতার সাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর প্রথম অভিনীত উড়িয়া চলচ্চিত্র ‘কথা দেইথিল্লি মা কু’ (২০০৩)। তারপর ২০১১ সালে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’, ‘মেমোরিজ ইন মার্চ’ এবং তাঁর সর্বশেষ পরিচালিত ‘চিত্রাঙ্গদা’তে অভিনয় করেন।

আজ কীর্তিমান এই মানুষটার প্রয়াণ দিবস। মৃত্যুর আগে প্রায় ১০ বছর তিনি ডায়াবেটিস এবং প্রায় ৫ বছর দরে প্যানক্রিয়াটিস রোগে ভুগছিলেন। প্রায় সারা জীবন ধরে তিনি ভয়াবহ রকমের অনিদ্রায় ভুগেছেন। সে জন্য নিয়মিত ঘুমের ওষুধও খেতে হয়েছে।

ডাক্তারদের রিপোর্ট অনুযায়ী,অ্যাবডোমিনোপ্ল্যাস্টি ও ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্টের পর প্রয়োজনীয় হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি করাতে গিয়ে তাঁর শারীরিক অসুস্থতা বেড়ে যায়। অবশেষে ২০১৩ সালের আজকের এই দিনে অর্থাৎ ৩০ মে কোলকাতার নিজ বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর এই অকাল মৃত্যুতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো পুরো ভারতীয় চলচ্চিত্রাঙ্গন।

সবাই হারিয়ে যায়,যাবে। ঋতুপর্ণ ঘোষও হারিয়ে গিয়েছে কিন্তু রেখে গিয়েছে তাঁর অমর সৃষ্টি। ব্যক্তি ঋতুপর্ণ তাঁর সমকামিতার জন্য অনেকের চক্ষু শূলে পরিণত হয়েছিল, অনেকে তাকাতো বাঁকা চোখে। আজও এসব বহমান। তাঁর কর্মকে মানুষ যতোটা গ্রহণ করেছে ততটা ব্যক্তি ঋতুপর্ণকে গ্রহণ করেনি কখনোই। কারণ একটাই- সে সমকামী। আর এই দুই অক্ষরের শব্দটিই তাঁকে এতোটা সমালোচিত করছে, এতো বেশি কষ্ট দিয়েছে।

তাকে একজন মানব সন্তান হিসেবে বিবেচনা করলে এমন কি ক্ষতি হয়ে যেতো, তাঁরও তো অধিকার আছে একজন পুরুষ হয়ে তারঁই মতো আরেকজন পুরুষকে প্রেমিক হিসেবে পেতে। যেমনটা প্রত্যেকটা মানুষের আছে নিজের পছন্দমতো প্রেমিক-প্রেমিকা,সঙ্গী খোঁজার। তাঁর সারাজীবনের বয়ে বেড়ানো কষ্ট ছিলো, পুরুষ শরীরে নারীর মন। তা হলে বুঝি মানুষটা অচ্ছুৎ হয়ে যায়? হয়তো আমাদের কাছে হয়।

সে যা-ই হোক,যে চলে গিয়েছেন শত কষ্ট-বেদনা নিয়ে তিনি তো আর ফিরবেন না! যারা ব্যক্তি ঋতুপর্ণকে শ্রদ্ধা করেন,সম্মান করেন তাঁদের কাছে অনুরোধ, চোখে কাজল,আঙ্গুলে নেলপলিশ,পাঞ্জাবী,শাড়ি পরা কোন পুরুষদেহী নারীকে দেখে হাসবেন না, আঁড় চোখে তাকাবেন না, হাফ লেডিস বলবেন না,কাউকে বলতেও দিবেন না।

সর্বশেষ, তিনি ছিলেন একজন মানুষ। সমকামী, অসমকামী, বিষমকামী এসবের কিছুই তিনি ছিলেন না। একজন মানুষ যা যা করতে পারেন ঋতুপর্ণ তা-ই করে গিয়েছেন;তার থেকে আরো বেশি কিছু করে গিয়েছেন। তারপরও তাঁর সমকামীতা দিয়ে তাঁকে বিচার করাটা হবে চরম মূর্খতা।

তাঁকে নিয়ে লিখলে আগামী প্রয়াণ দিবস পর্যন্ত লিখলেও শেষ হবে না তাই আর একটি কথা বলে শেষ করছি- ঋতু’র সর্বশেষ ফেসবুক পোস্ট ছিলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত লাইন,”মনে রেখো আমায়”। তারই সুরে সুরে চলুন একবার গেয়ে উঠি, “ঋতুপর্ণ ভুলবো না তোমায়”। মানবিক পৃথিবীর দাবিতে হতাশায় ডুবে যাওয়া মানুষটিকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে সংবাদ২৪

#সংবাদ২৪/মইন/এমকে

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status