এক্সট্র্যাকশন-এর বাংলাদেশ বনাম আন্তর্জাতিক ওয়েব বাণিজ্যের চরিত্র

বিজ্ঞাপন

অনেক কথা হচ্ছে এক্সট্র্যাকশন সিনেমা নিয়ে, আসেন কিছু কথা আমরাও বলি। ২৪ এপ্রিল , ২০২০ সালে নেটফ্লিক্সে রিলিজ পেয়েছে এক্সট্র‌্যাকশন। সুপার হিরো থর চরিত্রের ক্রিস হ্যামসওয়ার্থ স্টারার এই মুভিটি পরিচালনা করেছেন অ্যাভেঞ্জার, ডেডপুল খ্যাত স্টান্টম্যান স্যাম হারগ্রেভ।

অ্যান্ডি পার্কস, জো রুশো আর ফারনানদো লিও গনজালেজ এর কমিক বুক সিউদাদ এর চিত্রায়ন। কলম্বিয়ান স্প্যানিশ শব্দ সিউদাদ এর মানে হচ্ছে সিটি বা বড় শহর।

এক্সট্র‌্যাকশন বানাতে নেটফ্লিক্স খরচ করেছে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৫৫২ কোটির একটু বেশি। ঢাকা নিয়ে গল্প হলেও ছবিটির শ্যুটিং হয়েছে ইন্ডিয়া- সেখানেই ঢাকার সেট বানানো হয়েছে।

এক্সট্যাকশন মুভি এবং এক্সট্র‌্যাকশনের বাংলাদেশ নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। পুরো বিষয়টা একটু অন্যভাবে দেখার চেষ্টা করি আসুন। আপনাদের কি মনে হয় নেটফ্লিক্স বোকা বা তাদের R&D টিম নাই? রিসার্চ আপনার পক্ষে বা রিয়েলিটির পক্ষে না গেলেই টিমের কাজ ভুল এমন ভাবারও কোন কারণ নাই। পুরোটাই হলো ইকোনমিকস, আজকের দিনে বিনোদন বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির অঙ্ক। আর বাণিজ্য সব সময় তার মূল ভোক্তাদের সন্তুষ্ট রাখে। তাই আমেরিকানরা তৃতীয় বিশ্বকে যেভাবে দেখতে চায়- সেভাবেই এক্সট্র‌্যাকশনে বাংলাদেশকে দেখিয়েছে নেটফ্লিক্স- এটাই তাদের আসল রিসার্চ।

বলতে পারেন বিজনেস ওরিয়েন্টেড রিসার্চ। আলটিমেটলি সাবসক্রাইবার ম্যাটার্স ভাই। কেন হলিউড ফিল্মে আগে ব্রাজিল – আর্জেন্টিনা দেখেন নাই- ঘিঞ্জি শহরে ছাদে ছাদে দৌড়াদৌড়ি? । তখন তো বলেন নাই হাইতি এমন কেন, ব্রাজিল এমন কেন, ওদের কি হাইরেঞ্জ বিল্ডিং নাই। আছে -সবই আছে – আমেরিকানরা ওসব দেশ সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে যেরকম ভাবমূর্তি দেখাতে চায়- সেরকমটাই দেখায়। দি হার্ট লকার মনে নেই- হালের প্যারাসাইট- বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্রকে ক্যাটাগরি বদলে মূল প্রতিযোগিতায় নিয়ে পুরষ্কারের বন্যা- কেন বিদেশী ভাষার ক্যাটাগরিতে পুরষ্কার দিলেই তো হতো। ট্রাম্প কেন হু কে ফান্ডিং বন্ধ করার ভয় দেখায় বোঝেন না, সব একই অঙ্ক।

আর যে কমিক বুকটা নিয়ে এক্সট্র‌্যাকশন ছবিটা- ওটার সম্পর্কে একটু ধারনা দেই তাহলেই বুঝবেন কোন মানসিকতা থেকে বাংলাদেশ কে বেছেছে তারা? আমাজনে বইটার কাহিনী সংক্ষেপ কি লেখা আছে , পড়েন একটু।

She was kidnapped and taken to the worst place on earth. He was hired to get her out. Now, they’re both trapped in a city that wants them both dead, and their hopes of getting out are fading fast. From the bloodthirsty criminals, to the corrupt police, to the kid hiding a Glock under his sweatshirt on the corner, everyone wants Tyler Rake and Eva Roche dead. Set in the real world locale of Ciudad del Este, CIUDAD explodes with breathtaking action and hyper violence from critically acclaimed writer Ande Parks [CAPOTE IN KANSAS, UNION STATION], writer/directors Joe & Anthony Russo [CAPTAIN AMERICA: THE WINTER SOLDIER], and artist Fernando León González!

আর কিছু বলার দরকার আছে কি? কিন্তু বাংলাদেশ কেন? বাংলাদেশের ব্যবসা নিয়ে আসলেই নেটফ্লিক্সের মাথাব্যথা নাই। কিন্তু ভারতকে নিয়ে কিন্তু আছে। তাই বাংলাদেশকে সেই worst place on earth হিসাবে নির্বাচন করলে আমেরিকানদের পাশাপাশি ভারতীয়দেরও একটু খুশী করা যাবে। শুধু বাংলাদেশের সাবসক্রাইবার কেন নেটফ্লিক্স বাংলা ভাষাকেও গোনে না আপাতত।

কলকাতার মেকাররা নেটফ্লিক্সে অরিজিনাল বা সিরিজ করার কম চেষ্টা করে নাই। কোন লাভ হয় নাই। ওরা বাংলা ভাষায় ও ইনভেস্ট করবে না। শুধু কিছু কনটেন্ট কিনে রাখবে এই যা।

আর কলকাতার ঢঙে বাংলা বলার বিষয়ে আপনাদের যে তীব্র আপত্তি এখানেও কমার্স ভাই। ভারতীয় ওয়েব গুলোর সাম্প্রতিক গবেষণা হচ্ছে- আমাদের বাংলাদেশের বাংলা বলার ধরণটা ঠিক ভারতীয়রা নিচ্ছে না, পছন্দ করছে না। আর বাংলাদেশের সাবস্কাইবার উপর ভরসা করে এখনও কনটেন্ট বানানো যাচ্ছে না, তাই দুই দেশকে হাতে রাখতে ওরা একই কনটেন্ট বাংলাদেশের বাংলা আর কলকাতার বাংলা দুই ভাষায় ডাব করার কথা ভাবছে।

ঘরে ঘরে হিন্দি গান বাজানো যে বিষয়টি-ওটাও কমার্স। ভারতকে খুশী করার কমার্স। সাংস্কৃতিক ভাবে আমরা ভারতের উপর নির্ভরশীল এটা ভাবতে ভারতীয়রা নিশ্চয় পছন্দ করবে কারণ ভারতীয় সাবসক্রাইবারদের নেটফ্লিক্স গোনে। ভালই গোনে। আর বিয়ে বাড়ীর ছাদের অনুষ্ঠানের গানের প্লেলিস্ট শোনেন- তাহলে বুঝবেন এর পেছনে ওদের লজিকটা শক্ত। ৫ টা হিন্দি গানের পরে ১ টা বাংলা গান বাজে- ওটাকে বেছে নেয়ার কি দরকার- যদি তা ব্যবসায় ক্ষতি করে। এক্সট্র্যাকশনে যা হয়েছে- সব ওয়েব বাণিজ্যেরই অঙ্ক।

তাহলে কি নেটফ্লিক্সে- রিসার্চ করে কিছুই হয় না, অবশ্যই হয়। ঐ যে ব্যবসায় ক্ষতি না করলে হয়। পুরো অথেনটিক রিসার্চ করেই হয়। বাংলাদেশে যদি নেটফ্লিক্সের রেভিনিউ বড় অংশ দিত- তাহলে আপনার যা চাচ্ছেন- সব হতো। এখন যারা রেভিনিউ দেয়- তারা যা দেখতে চায়- তা দেখিয়েছে। অনেক ভাল ভাল কাজও হচ্ছে- স্বীকৃতিও পাচ্ছে। নীচের ৯টা ছবির পোস্টার দিলাম- নেটফ্লিক্সের সেরা অরিজিনাল মুভি যেগুলো ক্রিটিকালি ভীষণ সফল।

 

আরেকটা বিষয়- কোন দেশকে সিনেমায় কেমন দেখালো তাতে বেশিরভাগ দেশেরই কিছু যায় আসে না।
কারণ সিনেমাকে সিনেমাই ভাবে সবাই – আমরাই একটু বেশি সিরিয়াস। ফিকশনাল ক্যারেক্টার আর রিয়েল ক্যারেক্টার গুলোকে প্রায়ই মিলিয়ে ফেলি।

এই সিরিয়াসনেসটা যে আসলে ক্ষতি- আর সেই ক্ষতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে সিনেমা ইন্ড্রাস্ট্রি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণন আমাদের সেন্সর বোর্ড- পুলিশ-মন্ত্রী দের খারাপ দেখালেই তারা ভাবে আসল পুলিশ মন্ত্রীকে খারাপ দেখানোই হলো বুঝি। ঐ যে সেই মানসিকতা- সেন্সর বোর্ডে তো আমরাই আছি- বিদেশীরা তো আর বসে নাই। তাই সারা বিশ্ব যখন ইচ্ছেমত নানা কনটেন্ট নিয়ে কাজ করছে- তখন আমাদের কনটেন্ট নির্বাচনে ভীষণ সীমাবদ্ধতা। তার ফলও চোখের সামনেই – দর্শকরা সরে যাচ্ছে।

বাংলাদেশকে যেভাবে দেখানো হয়েছে তার রিভেঞ্জ নেয়া হোক- বাংলাদেশের অন্য চেহারাটা দেখিয়ে। নেটফ্লিক্স ও পারে, তাছাড়া অন্য ওয়েব প্লাটফর্ম তো আরও আছে। সিনেমার প্রতিবাদটা তো এভাবেই হয়।

তবে হ্যাঁ – আরেকটু ডিপলি রিসার্চ করলে- আর ডিটেইলিং এর লক্ষ রাখলে বাণিজ্যে খুব ক্ষতি হতো বলে মনে হয় না। এমনিতেও এই ছবি খুব বেশি কিছু দেবে না নেটফ্লিক্সকে অথচ তারা অনেক আশা করেছিল।

আর সিনেমা হিসাবে এক্সট্র্যাকশন ভাল না এটা অন্য হিসাব। তার সাথে উপরের অঙ্কের কোন সম্পর্ক নাই। স্লামডগ মিলিওয়নার ভাল সিনেমা হওয়াতে ভারতকে ভীষণ ডার্ক ভাবে দেখানোর বিষয়টি হারিয়ে গেছে- সেই ছবিতে যে সব ভারতীয়রা কাজ করেছিল সবাই প্রাউড ফিল করে। আর সব ছবির ক্ষেত্রেই ভাল হবে নিশ্চিত হয়েই কিন্তু প্রডিউসার বা স্টুডিও ফান্ড করে- তারপরই বেশিরভাগই সিনেমাই ভাল হয় না- লসও হয়, অখাদ্য মুভিও হয়- সিনেমার বৈশিষ্ট্য এটাই। সিনেমা ব্যবসায় শতকরা ১০ ভাগ ছবি ক্রিটিক্যালি বা কমার্শিয়ালি সফল হয় – এই অনিশ্চয়তায় আমরা বাড়াবাড়িটা খারাপ ছবি নিয়ে করিনা- ওতে সময় নষ্ট- ভাল মুভি হলে করি- ওটাই রেয়ার। ওটাই উ’ৎসব।

সংবাদ২৪-এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব।
প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে 
এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় 
কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়।

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status