এক কিশোরীর জীবন স্বাধের গল্প

বিজ্ঞাপন

মাত্র সাড়ে চৌদ্দ বছর বয়সের এক কিশোরীর সাথে রাত্রীযাপন করেছিলাম। তখন আমি টগবগে এক যুবক। উথালপাতাল আমার যৌবন। এরপরও আমি পারিনি। অজানা এক ভদ্রতা আমাকে বাধা দিয়েছিলো। খাটের এক কিনারে ভয়ে কুঁচকে যাওয়া কিশোরীটি গুটিসুটি মেরে অন্যদিকে পাশ ফিরে শুয়েছিলো। সামান্য মানবতাবোধ থাকলে আতঙ্কিত একটি মানুষকে আর আতঙ্কিত করা যায় না। অগত্যা খাটের মাঝ বরাবর কোলবালিশ দিয়ে বিস্তর দূরত্ব বজায় রেখে খাটের এক প্রান্তে আমি শুয়ে পড়ি। কতো কথাই বলার ছিলো, বলা হলো না। তাকিয়েছিলাম তার পিঠ, ঘাড়, মাথা থেকে নিয়ে কোমর ছাড়িয়ে পায়ের ধবধবে গোড়ালি পর্যন্ত। সে যে সজাগ, তা তো বোঝাই যাচ্ছিলো। বেশ অনেকক্ষণ পর্যন্ত লাইট জ্বালিয়ে রেখে অবশেষে এক সময় বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

এমন একটি মেয়েকে অপরিচিত এক যুবকের হাতে যারা তুলে দিয়েছিলেন তারা আসলে জেনে শুনে একটি বড় জুলুম করেছিলেন। চৌদ্দটি দিন মেয়েটির সাথে আমার রাত্রীবাস হয়েছিলো। আমি স্পষ্টত বুঝতে পেরেছিলাম একজন আতঙ্কিত মানুষের রাত কীভাবে কাটে। টুকটাক কথা যাই বলেছি, সে কোনো উত্তর দেয়নি। চরম বিরক্তি নিয়ে কেবল শুনে গিয়েছে। সে এতোটুকু বুঝেছিল যে আমার হাত থেকে তার পালানোর কোনো রাস্তা নেই। চৌদ্দটি নির্ঘুম রাতে সে কখনও একটু আধটু যে ঘুমায়নি তা কিন্তু না। কখনও ঘুমজনিত প্রচণ্ড ক্লান্তি তাকে নির্ভয় করে দিলে অল্প সময়ের জন্য ঘুমের রাজ্যে সে হারিয়ে যেতো। তখনও আমি না ঘুমিয়ে জেগে থাকতাম। ওই যে ভিতরের হিংস্র দানবটা, সেটা বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইতো। তারপরও উপরওয়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা, আমি নিজের ভদ্রতার গণ্ডি অতিক্রম করিনি। মাঝখানে কোলবালিশ আর খাটের দুই প্রান্তে আতঙ্কিত সে আর বন্য আমি।

যা বলছিলাম, সে মাঝে-মধ্যে রাত নিশুতি হলে ক্ষণিকের জন্য ঘুমিয়ে পড়তো। স্বভাবতই শরীরের উপর তার আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকতো না। তখন সে আমার দিকে পাশ ফিরতো, চিৎ হতো, উপুড়ও হতো। আমি দেখতাম। ভদ্রতার বসন খুলে ফেলে নির্লজ্জ হয়ে একজন কিশোরীর উপচে পড়া রূপ দেখতাম। কপালের শুভ্রতা,বাঁকানো ভ্রু, টানা টানা চোখ, তুলতুলে গাল,টিয়া পাখির মতো টিকালো নাক, কমলা কোয়া ঠোঁট। তখন আর কিশোরীকে মানবী মনে হতো না। মনে হতো বেদিতে শুয়ে থাকা কোনো শিল্পীর গড়া নিখুঁত মূর্তি। জীবনে তো আর কম নারী দেখিনি। সেই হিসাবে বলছি, দেবী ছাড়া কোনো মানবীর এমন আগুনঝরা নিখুঁত সুন্দরী হওয়া আসলেও সম্ভব না। শরীরের প্রতিটি খাঁজে যেন শিল্পীর নিখুঁত টান। আমি কী যে মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকতাম তা বলে বুঝাতে পারবো না। কিন্তু যখনই টের পেতাম সে জেগে উঠেছে তখনই আমি নিজেকে গুটিয়ে নিতাম। সেই কোলবালিশের দূরত্ব, ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে পড়ে থাকা।

চৌদ্দ দিন পরের ঘটনা। বৈশাখ মাসের নিশুতি রাতে ঈশাণ কোণে মেঘের গুড়গুড় ডাক। বিদ্যুৎ চলে গেছে। কিশোরী তখন অনিচ্ছা-নিদ্রায় আতঙ্কের জগত থেকে অনেক দূরে। এমন সময় আশপাশে কোথাও প্রচণ্ড শব্দে বজ্রপাত ঘটে। কানে তালা লাগা অবস্থা। আর তখনই জন্ম নেয় সেই স্মৃতি হয়ে যাওয়া দুর্লভ ঘটনা। প্রচণ্ড চিৎকার দিয়ে কোলবালিশ ডিঙ্গিয়ে কিশোরী আমাকে জাপটে ধরে। হালকাপাতলা গড়নের ছোট দেহটা আমার বুকের সাথে লেপ্টে যায়। আমার চিবুকের নিচে তার মাথা, নাক বরাবর তার চুল, সুবাসিত হয়ে আমার নিঃশ্বাসে আসা যাওয়া করা তার চুলের ঘ্রাণ, আর আমার বুকের সেই খালি অঞ্চলটা যেখানটায় গেঞ্জি গায়ে থাকলেও উদোম থাকে, সেখানে তার নাকের স্পর্শ এবং ছড়িয়ে পড়া গরম নিঃশ্বাস ,চিরদিনের জন্য আমার জীবনের অতুলনীয় স্মৃতি হয়ে ওঠে। আমি শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। যতোখানি শক্তি আছে আমার দু’বাহুতে সবটুকু দিয়ে তাকে শঙ্কামুক্ত রাখি।

পাঠক, এর পরেরটুকু স্বার্থপরের ইতিহাস।যতোই দিন যেতে থাকে বুঝতে পারি মেয়েটি চরম স্বার্থপর। এমন শক্ত বাঁধনে তাকে জড়িয়ে ধরে রাখতে সে রোজ-প্রতিরোজ আমাকে বাধ্য করতে থাকে। এরপরও তার অভিযোগের শেষ থাকে না। যেহেতু আমি রাতে বেশি ক্লান্ত হই সে ততোটা হয়না, সেজন্য ভোরে আমার চোখে ঘুম থাকে বেশি।ফলে প্রতিদিন আমার আগে সে ঘুম থেকে জেগে ওঠে আর নিজেকে দেখতে পায় আমার বাহুমুক্ত। তখনই তার কণ্ঠে জমা হয় একগাদা অভিযোগ।

: আজ তুমি আমাকে একটুও জড়িয়ে ধরোনি।

: বলো কি ? তোমাকে জড়িয়ে ধরেই তো ঘুমিয়েছি।

: প্রথমে একটু ধরেছো ঠিক পরক্ষণেই বাঁধন আলগা করে দিয়েছো। তুমি আমাকে মোটেও ভালোবাসো না। আমি তো তোমার কাছে একটি জিনিসই চাই যে, সারারাত তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকো। কখনও জামা ,জুতা ,অলঙ্কার এসব চেয়েছি?

ততোক্ষনে আমি ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আবার জড়িয়ে ধরি। ঈষৎ অভিমানে সে ঝাপটা মেরে আমার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। আমি দু’বাহুর বাঁধন আরও কঠিন করি আর ভাবি, দয়াময় সত্যিই সেদিনের ভীতু কিশোরীকে ব্যতিক্রম করে সৃজন করেছেন। যার জীবনে চাওয়া বলতে কিছু নেই। এমনও হয়েছে তার একটি মাত্র পেটিকোট, কামিজ ছিড়ে কোমরের দিক থেকে পেটের দিকে যাত্রা শুরু করেছে তবু কিছু বলছে না। কখনও কোথাও দু’জন বেড়াতে বেরিয়েছি তখন দেখি তার পায়ে রূপসার হাওয়াই চপ্পল । রাগত স্বরে তখন জিজ্ঞেস করেছি, চামড়ার জুতা যে ছিড়ে গিয়েছে সেটা আমাকে বলোনি কেন? আমি কি এতো দরিদ্র হয়ে গিয়েছি যে তোমার জন্য চামড়ার স্যান্ডেল কিনে আনতে পারবো না?

বরাবরের মতো তার সহজ উত্তর, “তোমার কাছ থেকে যদি চেয়ে চেয়ে নিতে হয় তবে আমার প্রতি তোমার দৃষ্টি কমে যাবে। ভালো করে আমার দিকে তাকাবে না। আমার কি আছে, কি নেই সেটা খুঁজে বের করবে না। তখন পরনারীর প্রতি তোমার নজর চলে যাবে। তাই কখনই চেয়ে কিছু নেবো না। কোনোকিছু চেয়ে নেয়ার থেকে তোমার মনোযোগ কেড়ে নেয়া আমার কাছে বেশ আনন্দদায়ক । আলতা-লিপস্টিকে, জুতা-শাড়িতে আমার তৃপ্তি নাই, তৃপ্তি খুঁজে পাই তোমার নৈকট্যে। রাতের বেলায় তুমি যে শক্ত করে জড়িয়ে রাখো সে টুকু হলেই আমার চলে। আর কিছুর প্রয়োজন নেই।”

পাঠক, আপনাদেরকে একটি নির্মম সত্য না বললেই নয়। ভয়াবহ করোনার কালে বিজ্ঞজনেরা যখন কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন ইত্যাদি কঠোরভাবে মেনে চলতে বলছেন, তখন পরিমিত চাহিদার কিশোরী তার জড়িয়ে ধরার ছোট্ট পুরনো চাহিদার জন্য ঠিক আগের মতোই গো ধরে আছে। যদিও সে হাল্কা পাতলা গড়নের আগের কিশোরীটি নেই। জীবনক্ষয়ী মেদ তার শরীরের আনাচে কানাচে বাসা বেঁধেছে। আমার বাহুতেও আর সেই আগের জোর নেই, বার্ধক্য আর জরা কুরেকুরে খেয়ে অন্তঃসার করে ফেলেছে। ইচ্ছা থাকলেও আর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখতে পারি না। তবুও তার চাহিদা রয়ে গেছে আগের মতোই।

ভাবতে খুবই অবাক লাগে, অল্প অল্প করে দিনে দিনে কিভাবে জমে উঠেছিলো আমাদের চাঁদের হাট। ছেলে মেয়ে আর নাতি নাতনিতে ভরে গিয়েছিলো আমাদের আঙ্গিনা। কিভাবে যে এতো কি হলো তা যেন টেরই পাইনি। ভাঙ্গা হাটের অবেলায় সবাই চলে গিয়েছে যার যার মতো করে। জীবিকার টানে ছেলেমেয়েরা সবাই প্রবাসী হয়েছে সেই কবেই। পুরাতন ঠিকানায় কেবল রয়ে গিয়েছি আমরা দুই জন।বর্তমানে বিশাল বাড়িতে নিজেদেরকে খুব অসহায় ও একা একা লাগে।

কদিন আগে আমার কোভিড-১৯ পজিটিভ আসার পর একটি রুমে আমি নিজেকে স্বেচ্ছাবন্দি করে রেখেছি। ছেলেমেয়েরা আমাদেরকে নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন। বারবার ফোনে খোঁজ নিচ্ছে আর চোখ রাঙ্গাচ্ছে যেন তাদের নির্দেশমত দিনাতিপাত করি। আমি সব মানার চেষ্টা করলেও মানতে চাচ্ছে না বৃদ্ধা কিশোরী। যতোই বলি তুমি আমার কাছে আসবে না, ততোই সে বলে “শত বার আসবো। মরতে হলে এক সাথে মরবো বাঁচতে হলেও বাঁচবো এক সাথে।“

পাঠক, আপনারই বলুন, আত্মহত্যা করারও তো একটা বয়স আছে। আমাদের কি এখন আর সেই বয়স আছে?

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status