কমলগঞ্জের খাসিয়াপুঞ্জিতে বিদ্যুতায়নে বনবিভাগের বাধা, গ্রামবাসীর মানববন্ধন

বিজ্ঞাপন

গত ১২ ফেব্রুয়ারি গণ ভবন থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জাতীয়ভাবে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের  ঘোষণা করেছিলেন। তবে  বন বিভাগ ও বিদ্যুৎ বিভাগের রশি টানাটানিতে শতভাগ বিদ্যুতের আওতাভুক্ত হতে পারেনি কমলগঞ্জের  আদমপুর বনবিট এলাকার কালেঞ্জি খাসিয়াপুঞ্জি ও পুঞ্জির বাহিরের কালেঞ্জি গ্রাম।

নতুন করে কালেঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জি ও গ্রামে বিদ্যুতায়নের কাজ শুরু হলে শনিবার দুপুর ১২টায় কালেঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জির প্রবেশ পথে পুঞ্জি ও গ্রামের নারী পুরুষ মিলে দুই শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি গণ ভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কমলগঞ্জ উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় ঘোষণা করলেও মূলত কালেঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জি ও সংলগ্ন একটি গ্রাম বিদ্যুতের আওতার বাহিরে ছিল। এ নিয়ে গত ৪ মার্চ গণমাধ্যমে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল।

কালেঞ্জী খাসিয়া পুঞ্জির বিদ্যুতায়নে বন বিভাগের বাঁধা  ও বিদ্যুতের দাবিতে মানবন্ধন কর্মসূচি শুনে শনিবার (৪ জুলাই) সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৫শথ ফুট উপরে পাহাড়ি টিলার স্তরে স্তরে খাসিয়া সম্প্রদায়ের বসতঘর। আঁকা বাঁকা  পথে ১৫২টি সিড়ি বেঁয়ে টিলার উপরে পুঞ্জির হেডম্যানসহ অন্যদের বাসায় পৌছতে হয়। খাসিয়া পুঞ্জির ৯৫ পরিবারে প্রায় ৬শত লোকসংখ্যা। তাদের আয়ের প্রধান উৎস জুমের খাসিয়া পান ও লেবু। পুঞ্জির পার্শ্ববর্তী কালেঞ্জি গ্রামেরও ৫০টি পরিবারে প্রায় অর্ধ সহস্রাধিক লোকের বসবাস। তবে বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগেও বিদ্যুতায়ন পৌছেনি এ দুইটি গ্রামে। রাস্তারও বেহাল দশা।

খাসিয়া সম্প্রদায়ের সদস্যরা বলেন, মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি কমলগঞ্জ উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়ন ঘোষণা করেছে। অথচ এই দুটি গ্রাম এখনও বিদ্যুতায়নের আওতায় আসেনি। কালেঞ্জী খাসিয়া পুঞ্জির ৯৫ পরিবারের দৈনন্দিন নানা সমস্যায় জর্জরিত পুঞ্জির সদস্যরা। বন বিভাগের আপত্তির কারণে এ দুটি গ্রামে বিদ্যুতায়ন সম্ভব হচ্ছে না। পুঞ্জির নারী পুরুষ সদস্যরা টিলার নিচের কূপ থেকে পানি সংগ্রহ করে টিলার উপরে তুলে নিয়ে আসেন। বিদ্যুৎ সুবিধা প্রাপ্ত হলে বৈদ্যুতিক পাম্প বসিয়ে নিচ থেকে টিলার উপরে ঘরে ঘরে পানি তোলা যেতো।

পুঞ্জি হেডম্যান রিটেঙেন খেরিয়াম বলেন, বিদ্যুৎ ও রাস্তাঘাটের সমস্যার কারণে আমাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। কমলগঞ্জে লাউয়াছড়া ও মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকলেও বন বিভাগ অহেতুক কালেঞ্জী খাসিয়া পুঞ্জির  বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপনে বাঁধা  দিয়েছে। কমলগঞ্জকে সরকারিভাবে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা দিলেও কালেঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জি ও তৎসংলগ্ন গ্রাম বিদ্যূতায়নের বাহিরে রয়েছে।

এনিয়ে  বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর আবারও বনবিভাগ জরিপ কাজ করে। এ জরিপ কাজ শেষে শনিবার (৪ জুলাই) সকাল থেকে আবারও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি কালেঞ্জি পুঞ্জিতে নতুন করে বিদ্যুতায়নের কাজ শুরু করেন। আর তখনও বন বিভাগের লোকজন এ কাজে বাধা সৃষ্টি করে। আর তার প্রতিবাদে দুপুরে কালেঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জির ৯৫ পরিবারের সদস্য ও সাথের গ্রামের ৫০ পরিবারের সদস্য মিলে দুই শতাধিক নারী পুরুষের অংশ গ্রহনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।

পুঞ্জির হেডম্যান রিটেঙেন খেরিয়াম-এর সভাপত্বিতে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন,পুঞ্জির সহকারী হেডম্যান ওয়ানবর সুটিং , নাইট খেরিয়েম,সামায়ের খেরিয়াম,সামুয়েল ধার,মোবারক মিয়া, প্রমুখ। এসময় বক্তারা বলেন, সম্প্রতি কমলগঞ্জ উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়ন ঘোষনা করা হলেও আমরা কালেন্জির বাসিন্দারা বিদ্যুৎ সংযোগ পাইনি। তাই অতি শীঘ্রই  আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার দাবী জানাচ্ছি। অন্যতায় আমরা বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলবো।

আদমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদাল হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী কালেঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জি ও তার সাথের গ্রাম বিদ্যুতায়নের আওতায় আসতে হবে। গত মার্চ মাসে বন বিভাগ সর্ব শেষ সরেজমিন তদন্ত করেছে। শনিবার বিদ্যুৎ বিভাগ আবার কালেঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জি ও সাথের গ্রামে বিদ্যুতায়নের কাজ শুরু করলে  বন বিভাগ বাধা সৃষ্টি করে। যাহা সম্পূর্ণরুপে অযোক্তিক। তিনি আরও বলেন বনাঞ্চলে অন্যান্য খাসিয়া পুঞ্জিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকলেও কেন বন বিভাগ কালেঞ্জি পুঞ্জিতে বাধা সৃষ্টি করছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না।

আদমপুর বনবিট কর্মকর্তা শ্যামল রায় বলেন, কালেঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জি ও গ্রামে বিদ্যুতায়নের জন্য ইতিপূর্বে বন বিভাগ একটি জরিপ সম্পন্ন করলে বিদ্যুতায়ন কাজ শুরু করার সম্পর্কে তার কাছে বন বিভাগের কোন নির্দেশনা আসেনি। তাই তিনি আপাতত কাজটি বন্ধ রাখতে বিদ্যুৎ বিভাগকে বলেছেন।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী আশেকুল হক বলেন প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় কমলগঞ্জে শতভাগ বিদ্যুৎ নিশ্চিত হলেও কালেঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জি ও একটি গ্রাম বিদ্যুত সুবিধার বাহিরে রয়েছে। বন বিভাগের বাধা তা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।

মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি কমলগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডিজিএম প্রকৌশলী গণেশ চন্দ্র দাশ বলেন, কালেঞ্জি খাসিয়া পুঞ্জি ও কালেঞ্জি গ্রামকে বিদ্যুতায়নের আওতায় আনতে কাজ শুরু হয়েছিল। ঠিকাদারের লোকজনও খাসিয়া পুঞ্জি এলাকায় বৈদ্যুতিক খুটিও এনে রাখে। শুধুমাত্র বন বিভাগের আপত্তির কারণে এ দুটি গ্রামকে এখনও বিদ্যুতায়নের আওতায় আনা যায়নি। এ নিয়ে মাস ৩ আগে বন বিভাগ জরুরীভাবে জরিপও করেছে। তা হলে কেন তারা এখন বাধা প্রত্যাহার করছে না তা বোঝা যাচ্ছে না। শতভাগ বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতেই শনিবার থেকে আবারও ঠিকাদারের লোকজন বিদ্যুতায়নের কাজ শুরু করলে বন বিভাগের লোকজন বাধা দেয়।


সংবাদ২৪/কমলগঞ্জ/সাজু/এসডি

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status