করোনা সংকটে আমরা আসলে কোনদিকে যাচ্ছি?

বিজ্ঞাপন

আমরা আসলে কোনদিকে যাচ্ছি? আমরা কি করোনা নিয়ন্ত্রণে কোন মডেল ফলো করছি? এখন পর্যন্ত স্বীকৃত ও সফল দুটো মডেলই আছে।

এক: লোকাল লকডাউন অর্থাৎ যেখানেই এর সংক্রমণ সেখানেই সুস্থ কিংবা সংক্রমিত সকল মানুষজনকে নিজ নিজ অবস্থানে আটকে দেওয়া। জরুরি প্রয়োজনে বাহিরে গেলেও সামাজিক দূরত্ব বজাই রেখে বাহিরে যাওয়া। তখন সরকারকে অনেক মানবিক হতে হবে। যাদের ঘরে খাদ্য থাকবে না তাদের ঘরে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া।

দুই: বেশি বেশি টেস্ট করে যাদেরকেই সংক্রমিত পাওয়া যাবে কেবল তাদেরকে isolate করে চিকিৎসা দেওয়া বাকিদের অবাধে জীবন ও জীবিকার যুদ্ধে নামতে দেওয়া। আমরা কি এর কোনটি মেনেছি?

যখন সংক্রমণ বাংলাদেশে তখনো আসেনি তখন স্বাধীনতা চিকিৎসক নেতা ইকবাল আর্সলান, সাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রী ও অন্যান্য চিকিৎসা বিষয়ক বিভিন্ন সরকারি সংগঠনের নেতা টিভিতে এসে বলতে লাগলেন যদিও আমরা শতভাগ নিশ্চিত করোনা বাংলাদেশে আসবে না তারপরও আমরা আমাদের হাসপাতালগুলোকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রেখেছি।

বিভিন্ন প্রফেশনাল বডিতে যারা নির্বাচিত নেতা হন তাদের কেমন সেটাও আমরা জেনে গেছি। এই যদি হয় উপর লেভেলের ভাবনা তাহলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আমলারা প্রস্তুতি নিবে কেন? তারা বরং এটিকে অজুহাত ধরে নকল মাস্ক আর নকল পিপিই কিনে টাকা মারার ধান্দায় নেমে পরে।

বিদেশ থেকে বাংলাদেশিরা আসলে কোথায় কোয়ারান্টিনের ব্যবস্থা করবে সেই নিয়ে তাদের কোনরকম প্ল্যান বা পরিকল্পনা ছিল না। ১৩ই মার্চ আমি একটি স্ট্যাটাস দেই যে ইতালি থেকে শতাধিক বাংলাদেশী এমিরাতের একটি বিমানে করে ভোরে বাংলাদেশ পৌঁছুবে। আমি বলেছিলাম তাদের যেন বিমানবন্দর থেকেই কোয়ারান্টিনে নেওয়া হয়।

নিয়েছিল ঠিকই কিন্তু কোথায়? এর আগে চীন থেকে আসাদের হাজি ক্যাম্পে নিয়েছিল ইতালি ফেরতদেরও সেখানে নেওয়া হয়েছিল। ইউরোপে থাকাদের ভাব যে আলাদা সেটা আমাদের আমলারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। ঠিকই পরদিন বিশাল হৈচৈ বাধিয়ে ফেলে ইতালি ফেরতরা। তারপর তাদেরকে নিজ নিজ বাড়িতে গিয়ে নিজ দায়িত্বে কোয়ারান্টিনে থাকতে উপদেশ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

আর ওদিকে ভুটান কি করেছে। তাদের দেশে যারা বিদেশ থেকে এসেছে তাদেরকে ৩ অথবা ৪ তারকা হোটেলে রেখেছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের বিনামূল্যে খাইয়েছে আর সরকার তাদের থাকার খরচ দিয়েছে। ফলাফল ভুটান সফল। আমরাও যদি বিদেশ ফেরতদের কোয়ারান্টিনে রাখার সুবন্দোবস্ত করতে পারতাম আজকে আমাদের এই অবস্থা হতো না।

যখন আমাদের সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা তিনের ঘরের নামতা বেয়ে বাড়ছিল তখন আমরা যত শক্ত ব্যবস্থা নিয়েছিলাম ঠিক তার উলটা করতে থাকি যখন সংক্রমণ শতকের ঘরের নামতা বেয়ে বাড়ছে। এই দেশটা আসলে টাকাওয়ালাদের জন্য। যখনই টাকাওয়ালাদের চিকিৎসার একটি মোটামুটি ব্যবস্থা হয়েছে তখন থেকেই সব কিছু ঢিলেঢালা হওয়া শুরু। জীবন আগে না জীবিকা আগে এই প্রশ্নের মুখে পরে আমরা জীবিকাকেই বেছে নিয়েছি।

আসলে গরিবের জীবনের বিনিময়ে ধনিদের জীবিকা না কেবল বরং তাদের আয়ের পথ ঠিক রাখার ব্যবস্থার দিকে আগাতে থাকলাম। গোটা আরব দেশ এমন কি সৌদি আরবের সকল মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হলো। গতকাল শুনলাম ঈদের জামাতের জন্যও মসজিদ বন্ধ থাকবে। আর আমাদের এমন জিহাদি ভাব যে মসজিদ বন্ধ করলে কারবালা ঘটিয়ে দেওয়া হবে। দেখি শুক্রবারের জুমাতে স্বাভাবিক জুমা থেকেও বেশি মানুষ। বাজার, দোকান পাট সব খুলে দেওয়া হলো। এইটা কি কোন মানুষের দেশ?

একবার ভাবুনতো কাদের কথায় গার্মেন্টস কারখানা খুললো? একবার ভাবুনতো কাদেরকে প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা আসলো?
একবার ভাবুনতো শপিং-মল খুললে কাদের লাভ হবে?

একবার ভাবুনতো ভি আই পি হসপিটাল কাদের জন্য খুলল? একবার ভাবুনতো ত্রাণের চাল আর টাকা কাদের ঘরে যায়? এখন আবার বলা হলো যাদের নিজস্ব গাড়ি আছে তারা বাড়ি যেতে পারবে।

অর্থাৎ দেশটাই আসলে ধনীদের জন্য। এখন দেখছি হাজারে হাজারে মানুষ এখন গ্রামের দিকে ছুটছে। একই সাথে সরকারি হিসাবেই হাজারে হাজারে প্রতিদিন মানুষ করোনায় সংক্রমিত হচ্ছে। এখন ঢাকা গাজীপুর আর নারায়ণগঞ্জ হলো হট স্পট। এই মানুষগুলো এই হট স্পট থেকে যখন গ্রামে যাবে সেখানে ছড়াবে। আবার কিলবিল করে ঢাকায় আসবে এবং ছড়াবে।

আমরা কি কোন মডেল মানছি? আমরা কি কোন অংক মানছি? মানছি না কারণ এইসব মডেল আর অংক বোঝার মানুষ যে নীতিনির্ধারণীতে নেই। কেন আমলারাই করোনা সংক্রান্ত কমিটির হর্তাকর্তা হবেন? কোথায় এমপি আর রাজনীতিবিদরা? কোথায় বুদ্ধিজীবীরা? আমিতো কেবল হযবরল অবস্থা দেখছি!

  • অধ্যাপক- পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সংবাদ২৪-এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়।

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status