ক্রিকেটার মঈন আর মামুনুল হকের হিপোক্রেসি

বিজ্ঞাপন

 

বেশ কদিন আগেই মনস্থির করেছি ধর্মের সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে লিখব না। কিন্তু যখন দেখি সাধারণ ধর্মভীরু মানুষেরা যাদের পথপ্রদর্শক মেনে তাদের জীবনকে প্রভাবিত করে, সেই পথপ্রদর্শকরাই আসলে কতোটা মুখোশধারী এবং স্ববিরোধী। এই পরিস্থিতিগুলোই বাধ্য করে এসব নিয়ে ভাবতে ও লিখতে।

ক্রিকেটার মঈন আলী প্রসঙ্গে বলি, সম্প্রতি ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার মঈন আলীকে নিয়ে টুইট করেছেন লেখক তসলিমা নাসরিন। তিনি লিখেছেন, “ক্রিকেটার না হলে সিরিয়া গিয়ে আইএস-এ নাম লেখাতেন মঈন আলী”। তার এই টুইটের রেশ ধরে বলতে চাই মঈন আলীকে সিরিয়ার গিয়ে নতুন করে জঙ্গির খাতায় নাম লিখাতে হবেনা, কারণ তিনি নিজেই মননে জঙ্গিবাদ পোষণ করে থাকেন। এ নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই আসে নারীদের বিষয়ে তার চিন্তাধারার কথা। সকলেই জানে তিনি সাক্ষাৎকার নিতে আসা কোনো নারী সাংবাদিকের দিকে তাকান না। তিনি কথা বলেন অন্য দিকে তাকিয়ে। কারণ কী? উত্তরে বলবো গোঁড়ামি আর ধর্মান্ধতা। ধর্ম তাকে এই আচরণে উদ্বুদ্ধ করেছে যে একজন সাংবাদিক পরিচয়ের চেয়ে তার কাছে নারী পরিচয়টা মুখ্য। একজন সাংবাদিকের জন্য একজন ক্রিকেটারের কাছ থেকে পাওয়া এই আচরণ কি যথেষ্ট অপমানের নয়? এতে নারীদের হেয় করা নয়? এবার আসি তার হিপোক্রেসির দিকে।

তিনি যে ক্রিকেট খেলে আয় করেন তা তার ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী কতটা হালাল? খেলাধুলা সম্পর্কে ইসলাম কি বলে? ক্রিকেট খেলা কিংবা দেখা কি জায়েজ? তার থেকে উপার্জিত অর্থ কি বৈধ?

ইসলামী শরীয়তের ভিত্তিতে উত্তরগুলো জানা যাক। ক্রিকেট খেলার আয়োজন যেভাবে করা হয় তা ইসলামের দৃষ্টিতে কোন ক্রমেই বৈধ নয়। এ ধরনের খেলাধুলার লাইভ সম্প্রচার কিংবা আয়োজনের পূর্বে ধারণকৃত ভিডিও শোনা কোনটিই জায়েজ নয়। কারণ ধর্মমদে এতে নিষিদ্ধ বাদ্য বাজানো হয়। দর্শকসারি (গ্যালারী) দেখাতে গিয়ে নারীদের দেখানো হয় এবং এদের (নারীদের) উপরই বেশিরভাগ সময় ক্যামেরা স্থির করা হয়। কোন কোন খেলা চলাকালে তো স্টেডিয়ামেই অতিসামান্য কাপড় পরিহিত (তাদের ভাষায় অর্ধনগ্ন) নারীদের নাচের ব্যবস্থা করা হয়। এগুলো ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী স্পষ্টতই হারাম কাজ।

আর সশরীরে উপস্থিত হয়েও এ ধরনের খেলা উপভোগ করা জায়েজ নয়। এতে মুমিনের একাধিক গুনাহে লিপ্ত হওয়ার পাশাপাশি মূল্যবান সময় অপচয় হয়।

সুরা বাকারার, ২০৮ নম্বর আয়াতে আছে- “হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু।”

এখন কথা হলো, ক্রিকেটের মতো খেলাটি কিন্তু বিধর্মী অর্থাৎ অমুসলিমদের। বিধর্মীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এই ধরণের খেলা একজন মুসলিমের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় কীভাবে?

ক্রিকেট কোনো নিছক খেলা নয়, এটা নিয়ে চলে ভাগ্যপরীক্ষা অর্থাৎ জুয়াখেলা। ইসলামে জুয়াখেলা একটি হারাম ও ঘৃণিত কাজ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে তা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং জুয়ার মাধ্যমে উপার্জিত সম্পদ হারাম।

জুয়ার যাবতীয় প্রক্রিয়াকে হারাম এবং নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সূরা মায়েদা : ৯০-৯১ আয়াতে বলা আছে, “হে ইমানদারগণ, মদ, জুয়া, ও লটারি এ সবই শয়তানের কাজ। তোমরা এগুলো থেকে বিরত থাক। আশা করা যায়, তোমরা সফল হতে পারবে। নিশ্চয়ই শয়তান মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং আল্লাহর জিকির ও নামাজ থেকে তোমাদের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে। তাই তোমরা এসব জিনিস থেকে বিরত থাকবে কি?

সূরা বাকারা : ২১৯ আয়াতে বলা আছে, ‘তারা আপনাকে (নবী) মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, উভয়ের মধ্যেই রয়েছে মহাপাপ’।

মোটকথা হল, যদি ক্রিকেট খেলার মাঝে ফরজ/ওয়াজিব বিধান পালনে অলসতা, তাতে শরীয়ত বিরোধী কাজকর্ম যেমন নারীদের সংশ্রব, জুয়া, গান বাদ্য, বেপর্দা বা অনর্থক বিনোদন মাকসাদ হয়, তাহলে উক্ত ক্রিকেট খেলা এবং দেখা উভয়ই নাজায়েজ।

মজার ব্যাপার হচ্ছে মঈন আলী ইংল্যান্ডের জাতীয় দলের বাইরে গিয়ে খেলবেন বিশ্বের জুয়ার অন্যতম আসর আইপিএলের চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে।আর সেই আসরে জুয়াসহ নাচানাচি, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি তো থাকছেই। আরও মজার বিষয় দলটির কাছে আবেদন করেছিলেন জার্সি থেকে যেন মদের বিজ্ঞাপন সরিয়ে নেওয়া হয়। এ যেন এক কৌতুকের রঙ্গমঞ্চ। এতেই বোঝা যায় মঈন আলী কতোটা হিপোক্রেট।

এবার আল্লামা মামুনুল প্রসঙ্গে বলি, সারা বাংলাদেশ সয়লাব হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আল্লামা মামুনুক হক ইস্যুতে, সম্প্রতি তিনি সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত রয়েল রিসোর্টে এক নারীসহ আটক হয়েছিলেন। আটকের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও ভাইরালের সুবাদে দেখেছি সেখানে অবস্থানরত সকলকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করতে। পরবর্তীতে একই কাণ্ডে তার এবং তার পরিবারের একাধিক ফোনালাপ ফাঁস, সেই নারীর প্রথম স্ত্রীর সন্তানের দেয়া সাক্ষাৎকার এবং সর্বশেষ সেই নারীর ডায়েরির লিখা প্রকাশ হওয়ার মাধ্যমে জানা যায় এবং প্রমাণ হয় তিনি অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করেছিলেন।

এই মামুনুল হুজুররা প্রতিনিয়ত ওয়াজে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পসহ নারী বিদ্বেষী বক্তব্য প্রদান করে আসছে। নারীদের অধিকার খর্ব হয় এমন বক্তব্য দিয়ে আসছিল বারংবার। প্রচার করছিলো নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব হারাম, নারীর চাকরি করা হারাম, বিবাহবহির্ভূত যৌনতা হারাম, নারীপুরুষ ঘোরাফেরা হারাম ইত্যাদি, ইত্যাদি।

অথচ তিনি এতসব কিছুর পরে, ঘরে বউ থাকা স্বত্বেও অসহায় এক নারীর অসহায়ত্বের সুযোগে লালসা মিটিয়ে আসছে অনেকদিন ধরে, এরমধ্যে ফোনালাপের মধ্যে দেখা গেছে আরও অন্যান্য নারীদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে। অথচ ইসলামে বেগানা নারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা সম্পূর্ণভাবে হারাম এবং অনৈতিক। যে মানুষ সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে উগ্র ধর্মান্ধতা ছড়িয়ে উস্কে দিয়ে উগ্র মনোভাবী করে তুলে আবার সেই মানুষই নিজের বক্তব্যের সাথেই দ্বিচারিতা করে। বিষয়গুলো খুব গভীর চিন্তার আগামী প্রজন্মের জন্য।

উপরে উল্লিখিত ধর্মের রেফারেন্স এবং ব্যাখ্যাগুলো তুলে ধরেছি শুধুমাত্র তাদের দ্বিচারিতাগুলোকে সামনে আনার জন্য। আমার এসব ধর্মের রেফারেন্স টানার মানে এই নয় যে আমি ধর্মের অজুহাতে খেলাধুলায় মানুষকে নিরুৎসাহ করছি। আমি চাই এসব বাঁধাকে টপকে আমরা কেবল মাত্র ধর্মের বেড়াজালে আটকে না থেকে পুরো বিশ্বটাকে জয় করি। সেটা খেলাধুলা থেকে অত্যাধুনিক বিজ্ঞানের কোনো আবিষ্কার নিয়ে হোক। এই পৃথিবীতে মানুষ তার স্বকীয়তা থেকে নিজের পথকে নির্বাচন করুক। ধর্ম আর স্বার্থকে একত্রে মিশিয়ে সাধারণ মানুষের মাথা খেয়ে নিজের আখের গোছানোর পন্থা বন্ধ হোক।

আমি আরও চাই,  দুইজন ব্যক্তি তৃতীয় কোনো ব্যক্তির ক্ষতিসাধন না করে যে সিদ্ধান্ত ই নিবে তা বৈধ এবং নৈতিক সেটি হোক যৌন সম্পর্ক স্থাপন, প্রেম কিংবা বন্ধুত্ব। আর আমি এও বিশ্বাস করি বিশ্বের মানুষের মেলবন্ধনের অন্যতম মাধ্যম ক্রিকেট খেলা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্ব স্ব দেশকে তুলে ধরা এবং পরিচিতি লাভ করানোর ও মাধ্যম। ক্রিকেট সুস্থ ধারার সুস্থ মননশীলতার মাধ্যম। তাই এই অঙ্গন হোক উদারমনা ও সুস্থ চিন্তাধারার মানুষে ভরপুর।

লেখক: এক্টিভিস্ট

 

( এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। সংবাদ২৪-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

 

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status