তবে মামুনুলদের জয় হোক!

বিজ্ঞাপন

হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের আজকের ঘটনায় আমি একজন ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলতে চাই না। বান্ধবী বা বউকে নিয়ে যে কেউ অবকাশ যাপন করতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক দু’জন মানুষের যেকোনো সম্পর্ক আমার কাছে অপরাধ না, সেটা যদি শুধুমাত্র যৌনতাকেন্দ্রিকও হয়।

মামুনুল হককে এই কাজের জন্য আটক করার যাবে না, প্রচলিত কোনো আইনে তা সম্ভব নয়। একইসাথে যারা উনাকে এহেন অবস্থায় বিরক্ত করেছেন, অপদস্থ করেছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার আছে।

কিন্তু ব্যক্তি মামুনুলকে বাদ দিয়ে ইসলামিক স্পিকার মামুনুল কিংবা হেফাজত নেতা মামুনুলকে নিয়ে আমার সমালোচনা করার আছে। কারণ- উনারা বিবাহ বহির্ভূত নারী পুরুষের মেলামেশাকে অবৈধ বলেন। শুধু তাই নয়, স্বামী-স্ত্রী হলেও তাকে নিয়ে সুন্দর মুহূর্ত কাটানো বা অবকাশ যাপনে উনারা মত দেন না। বিবাহ বহির্ভূত এইরূপ সম্পর্ককে জেনাবেবিচার হিসেবে ব্যাখ্যা দিয়ে দেশব্যাপী একটা উগ্রবাদী মতবাদ ছড়িয়েছেন। রাস্তাঘাটে নারী-পুরুষকে একসাথে দেখলেই মানুষ অপমানসূচক দৃষ্টিতে তাকায়, নারী পুরুষ একসাথে কোথাও অবস্থান করলে পাড়া এক করে তাদের অপদস্থ করেন, হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট ও পার্কে নারী পুরুষকে একত্র পেলে বিভিন্ন অপবাদ দিয়ে তাদের হয়রানি করেন। নারী পুরুষের মেলামেশার খবর পেলে একজন সাধারণ নারীকে পতিতা বানিয়ে ছাড়েন, পুলিশ ডেকে হয়রানি করেন। এর সবকিছু করেন এই মামুনুলের অনুসারীরা।

অথচ আজকে মামুনুল সাহেব উপস্থিত ওই নারীকে তার স্ত্রী হিসেবে প্রমাণ করতে পারেননি। দু’জনে আলাদা হয়ে অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। মামুনুলের আসল স্ত্রীর সাথে উনার ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে সেখানে মামুনুল জানিয়েছেন ওই নারী আরেকজনের স্ত্রী, পরিস্থিতিতে পড়ে তিনি তাকে নিজের স্ত্রী পরিচয় দিয়েছেন। তিনি তার আসল স্ত্রীকে এও বলেছেন যদি কেউ তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে তাহলে তিনি যেন মিথ্যা বলেন, অর্থাৎ এটা মামুনুলের ২য় বউ সেটা যেন প্রথম বউ স্বীকার করেন। অথচ এতোক্ষণে মামুনুলের সাথে থাকা ওই নারীর প্রকৃত পরিচয় বের হয়ে গেছে। তিনি আরেকজনের বিবাহিত স্ত্রী। যদিও পরক্ষণে উদ্ধার হয়ে গিয়ে মামুনুল সাহেব ফেসবুক লাইভে এসে সেই নারীর পূর্বের বিয়ে আছে এবং তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার পর তিনি বিয়ে করেছেন বলে প্রমাণ করা চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। কারণ মূল নাটক আগেই ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। তিনি জমাতে পারেননি।

এদিকে মামুনুল দাবি করেছেন তিনি জান্নাত নামের ওই নারীকে ২ বছর আগে বিয়ে করেছেন। যতটুকু জানা গেছে সে নারী এখনও তালাকপ্রাপ্ত হননি। একই সাথে গত বছরের ডিসেম্বরে এক বক্তৃতায় মামুনুল হক তার পরিবারের বৃত্তান্ত প্রকাশ করেছিলেন সেখানে সেসময়ের এক বছর পূর্বের বিয়ে ও স্ত্রীর তথ্য তিনি জানাননি। পারিবারিকভাবে দ্বিতীয় বিয়ে হলে তার জন্য প্রথম স্ত্রীকে ব্কব্য শিখিয়ে দেয়ার কী আছে? আর তা অস্বীকার করে আসার কারণ কী? আর তা মিথ্যা হলে তাহলে অন্যের স্ত্রীকে তিনি কিভাবে বিয়ে করতে পারেন?   ক্রিকেটার নাসির ও তার স্ত্রী তামিমার ঘটনা নিয়ে এই মামুনুলের অনুসারীরাই তো ট্রোল করেছিল। তাহলে এখন একজন বিজ্ঞ আলেমের (রাজাকার পুত্র) ক্ষেত্রে কী হবে?

মামুনুল একটা দুর্বল যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করেছেন। যার দ্বারা প্রমাণ পাওয়া যায় যে জান্নাত উনার স্বীকৃত স্ত্রী নয়। তিনি উপস্থিত জনতার কাছে বলেছেন ওই নারীকে তিনি শরিয়াহ মোতাবেক বিয়ে করেছেন এবং তার সাক্ষী আছে। তিনি কোনো আইনি প্রমাণ দেখাতে পারেননি। এখন তাহলে জানার বিষয় মামুনুল যে বিয়ে করেছেন (তার ভাষ্যে) সেটি কেমন বিয়ে?

এটি হতে পারে মুতা বিবাহ। একটি স্বল্প সময়ের বিবাহ। অর্থাৎ কোন নারী ও পুরুষ অল্প কিছু সময়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে এ বিবাহ করতে পারে। ইরানে এই পদ্ধতি চালু আছে। মূলত পতিতালয়ের বৈধতা দিতে এই বিয়ে চালু করা হয় ইরানে। যা শরিয়তসম্মত। অর্থাৎ একজন পুরুষ নির্দিষ্ট পরিমাণ মহারানা দিয়ে একজন নারীকে মুতা বিয়ে করেন। নির্দিষ্ট কিছু সময় যৌন সম্পর্কে মিলিত হওয়ার পর তারা উভয়ে তালাক দিয়ে দেন। যার কিন্তু সাক্ষীও থাকে। সে হিসেবে মামুনুল সাহেব মুতা বিয়া করেছেন হয়তো।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ বলছে উনাকে আটক করা হয়নি দুষ্কৃতকারীদের থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। হ্যাঁ আমি মনে করি উদ্ধারই করা উচিত। যারা আটক করেছে তারা দুষ্কর্ম করেছে। প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষ এমনটা করতে পারেন সেটা মুতা বিয়ে হোক কিংবা অন্য কিছু হোক। এই কাজে যারা বাধা দিতে তারা অপরাধ করবে। কিন্তু পুলিশ ভাই, কাবিননামা সাথে না থাকায় কক্সবাজার স্বামী-স্ত্রীকে অপদস্থ আপনারা করেননি? প্রেমিক-প্রেমিকাকে এক সাথে পেয়ে মেয়েটিকে পতিতা বানিয়ে আর ছেলেটিকে খদ্দের বানিয়ে কোর্টে চালান করেছেন আপনারা, এক ঘরে নারী-পুরুষকে পেয়ে অসামাজিক কাজ বলে সাংবাদিক ডেকে তাদের ছবি তোলে এই মামুনুলদের সমাজের কাছে অপরাধী বানিয়েছেন কত মানুষকে তার তালিকা আছে? সুনির্দিষ্ট আইন না থাকার পরও আপনারা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করেন কিন্তু মামুনুলদের ক্ষেত্রে আপনাদের আইনের স্বচ্ছ ব্যবহার দেখান। তাও ভালো আপনারা স্বচ্ছতা দেখিয়েছেন।

এবার আলোচনার খাতিরে ধরেই নেই ওই নারী মামুনুলের প্রকৃত স্ত্রী (ইসলামে বহু বিবাহ ও মুতা বিয়ে বা গণিমতের দাসীও হালাল আছে)। মোদি বিরোধী আন্দোলনের নামে সাধারণ গু-ভর্তি মাথাওয়ালা মাদ্রাসাছাত্রসহ তথাগত তৌহিদি জনতাকে মাঠে জেহাদে নামিয়েছেন এই মামুনুলরা। উগ্রবাদী মতবাদ ছড়িয়ে সাধারণ মাদ্রাসা ছাত্রদের মারমুখী করেছিলেন, তারা সহিংসতা চালাতে গিয়ে অকাতরে জীবন দিয়েছিল রাজপথে। তাদের সেই রক্ত হাতে নিয়ে তিনি নতুন কর্মসূচি দিলেন। সরকার ও দেশের সংবিধানের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষকে লেলিয়ে দিয়ে এতোগুলা মানুষের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে তিনি আমোদ করতে গেলেন রিসোর্টে। সারা দেশের হেফাজতের সমর্থকরা যখন শোকে মোহহীন হয়ে আছেন তখন তিনি আমোদ করছেন।

আরও নির্লজ্জ উদাহরণ দেখলাম, সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত পরস্ত্রী নিয়ে মামুনুল আমোদ করছিলেন (যা ইসলামে হারাম) জানার পরও কিছু মানুষ তাকে উদ্ধার করতে হামলা চালালেন সেই রিসোর্টে। তাণ্ডব চালিয়ে পুলিশের থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলেন। সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দাড়িওয়ালা ইমানদাররা মিছিল বের করে স্লোগান দিলেন “মামুনুল হক ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই”। আমাদের জাতি কত নির্বোধ, নূন্যতম বুদ্ধিহীন, চিন্তাশক্তি এদের এতোই দুর্বল ও এতোটাই অন্ধকারে নিমজ্জিত তাঁরা। আর এই অন্ধকারই মামুনুলদের উদ্দেশ্য ও সার্থকতা।

পরিশেষে বলছি মামুনুলের এই কাজকে আমি অপরাধ হিসেবে দেখছি না। কিন্তু তাঁর এই স্ববিরোধিতা ও ধর্মের নামে চালানো কুৎসার জবাব দিচ্ছি মাত্র। মামুনুলের এই কাজকে কুকর্ম মনে না করে যারা উনার পক্ষ নিচ্ছে আপনাদের বলছি- কারো ক্ষতি না করে দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজেদের ইচ্ছেতে কোনো বিপত্তি ছাড়া যেন রাস্তায় হাত ধরে হাটতে পারে, এক ছাদের নিচে থাকতে পারে, ভালোবাসতে পারে, অবকাশে যেতে পারে, প্রেম করতে পারে। আপনারা ধর্মকে বাধা হিসেবে টানবেন না কোনো মানবিক ও জৈবিক সম্পর্কের মধ্যে। যদি এটা সবার ক্ষেত্রে মানতে পারেন তবে মামুনুলদের জয় হোক…. সকল সাম্প্রদায়িক কাজকে ছুঁড়ে ফেলে এই একটা জায়গায় মামুনুলকে আমি সমর্থন দিলাম না হয়?

লেখক: সাংবাদিক ও এক্টিভিস্ট

বিদ্র: সংবাদ২৪-এর খোলামত বিভাগের লেখায় দায় লেখকের ব্যক্তিগত। এর আদর্শিক মত ও ব্যক্তিগত মন্তব্যের সাথে আমাদের সমর্থন খোঁজা প্রাসঙ্গিক নয়। এই বিভাগ আমাদের সম্পাদকীয় নীতির আলোকে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status