বিবাহ রেজিস্ট্রার হতে আয়েশার লড়াই

বিজ্ঞাপন

দেশের উচ্চ আদালত রায় দিয়েছে- কোনো নারী বিবাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) পদে আসীন হতে পারবেন না। কিন্তু তা মানতে নারাজ আয়েশা সিদ্দিকা। হাল না ছেড়ে বিবাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) হতে ইচ্ছুক আয়েশা সিদ্দিকা আবারও উচ্চ আদালতে রিট করেছেন। আগামী ৪ এপ্রিল শুনানি হবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে।

আয়েশা সিদ্দিকার চাওয়া ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারী বিবাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) নিয়োগের স্বপক্ষে আলোচনা উঠে আসবে এবং ৪ এপ্রিল শুনানি অন্তে তার পক্ষে রায় দেবেন বিজ্ঞ বিচারক।

আয়েশা সিদ্দিকার একমাত্র মেয়ে স্কুলপড়ুয়া উম্মে হাবিবা মায়ের লড়াইয়ের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে জানায়, ‘বেগম রোকেয়ার মতো তার মাও লড়াই করে নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) হওয়ার দাবি আদায় করে নারীদের জন্য নিকাহ রেজিস্ট্রারের পদটি উন্মুক্ত করবেন।’

আয়েশা সিদ্দিকার বাড়ি দিনাজপুরের ফুলবাড়ি পৌর শহরের ৮নং ওয়ার্ডের কাটাবাড়ি এলাকায়। তার স্বামীর নাম সোলায়মান মণ্ডল। তিন সন্তান নিয়ে তিনি সেখানেই থাকেন। স্বামীর সঙ্গে বাবার রেখে যাওয়া সিদ্দিকীয় হোমিও হল নামের একটি চিকিৎসালয়ে সময় দেন তিনি।

আয়েশা বলেন, ২০০৯ সালে ফুলবাড়ি পৌরসভা দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত হলে প্রতি তিনটি ওয়ার্ডের জন্য একজন করে বিবাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) প্রয়োজন হয়। এর আগে পৌরসভাটি তৃতীয় শ্রেণির থাকায় একজন বিবাহ রেজিস্ট্রার দিয়েই কাজ চলছিল। সেই সময় নিয়ম পরিবর্তন হওয়ায় ৪, ৫, ৬ এবং ৭, ৮, ৯ নং ওয়ার্ড বিবাহ রেজিস্ট্রার লাইসেন্স প্রদানের নিমিত্তে বিধি-৬(২) ধারা মোতাবেক দরখাস্ত আহ্বান করে কর্তৃপক্ষ। সেই বিজ্ঞপ্তি দেখে ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের জন্য আয়েশা সিদ্দিকা, আলেয়া খাতুন এবং নাজমুন নাহার নামে তিনজন নারী নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়ার আবেদন করেন।

সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ পাঁচ সদস্যদের একটি সুপারিশ কমিটি করে দেয়া হয়। কমিটিতে ছিলেন সাবেক গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান এমপি, তৎকালীন ফুলবাড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার এবং পৌর মেয়র। সুপারিশ কমিটি তাদের মধ্যে আয়েশা সিদ্দিকাকে প্রথম করে মন্ত্রণালয়ে একটি সুপারিশ পাঠায়।

একই সময় ৪, ৫ ও ৬নং ওয়ার্ডের জন্য সাকোয়াত হোসেন নামের এক ব্যক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকেও ওই সুপারিশ কমিটি অনুমোদন দেয়।

পরে সাকোয়াত হোসেনকে নিকাহ রেজিস্ট্রার করা হলেও আয়েশা সিদ্দিকাকে নারী হওয়ায় বাদ দেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিজ্ঞপ্তিতে নারী বা পুরুষ কোনোটিই উল্লেখ ছিল না।

আয়েশা সিদ্দিকার স্বামী সোলায়মান হোসেন বলেন, আয়েশা সিদ্দিকাকে বিবাহ রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ না দেওয়ার কারণে সেই নিয়োগের বিপক্ষে ২০১৪ সালের জুলাই মাসে হাইকোর্টের দারস্থ হন। দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর আইনি লড়াই শেষে ২০২০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দেশের সামাজিক ও বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো নারী বিবাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) পদে আসীন হতে পারবেন না এমন রায় দেন আদালত।

সেই সময় আয়েশা সিদ্দিকার পক্ষে হাইকোর্টের আইনজীবী ছিলেন হুমায়ন কবির। রায়ের পর আয়েশা একই বছরের মার্চ মাসে রায়ের বিপক্ষে আবারও সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। মামলাটি চলমান থাকলেও ২০২০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ হয় চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি। বর্তমানে মামলাটি পরিচালনার জন্য সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ফৌজিয়া করিম ফিরোজা সহায়তা করছেন।

মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রীকরণ) আইন ১৯৭৪ সালের ৫২নং আইনের ৪নং ধারায় বলা হয়, ‘বিবাহের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের জন্য নিকাহ রেজিস্ট্রারের প্রয়োজন নাই। যদিও তদকর্তৃক উক্ত অনুষ্ঠান সম্পন্ন হইতে বাধ্য নহে। ধর্মীয়ভাবে বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পরই রেজিস্ট্রেশনের প্রশ্ন আসে।’

‘এছাড়াও ধারা-৫ এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পাদনের জন্য নিকাহ রেজিস্ট্রারের প্রয়োজন নাই। অন্য যে কেহ ধর্মীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন করিতে পারেন।’

সেই সময় ৪, ৫ ও ৬নং ওয়ার্ডের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত বিবাহ রেজিস্ট্রার সাকোয়াত হোসেন বলেন, ২০১২ সালের আবেদনের প্রেক্ষিতে তৎকালীন সুপারিশ বোর্ডে সুপারিশ করে আমাকে এবং আয়েশা সিদ্দিকাকে এমপি মোস্তাফিজুর রহমান ডিও দেন। এরপর আমাকে নিয়োগ দিলেও আয়েশার নিয়োগ হয়নি।

তিনি বলেন, আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলছি, আয়েশা সিদ্দিকার বিরুদ্ধে রায় ইনজাসটিস হয়েছে। এ রায়ে অধিকারবঞ্চিত হয়েছেন তিনি। কারণ মহিলা যদি ধর্মশিক্ষক থাকতে পারেন, মহিলা প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিচারপতি থাকতে পারেন তাহলে মহিলা কাজি থাকতে পারবে না কেন? কাজি কিন্তু বিবাহ পড়ান না। বিবাহ রেজিস্ট্রেশন করেন।

তিনি বলেন, বিবাহের জন্য শর্ত হলো ইজাব, কবুল ও সাক্ষী। এখানে ইমামের কোনো পাঠ নেই, রেজিস্ট্রারের কোনো পাঠ নেই। বিবাহে খুৎবা পড়া সুন্নত। পাঠ করলেও হবে না করলেও বিবাহ সম্পূর্ণ হবে।

ওই পৌরসভার ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলাম বলেন, নিকাহ রেজিস্ট্রার সম্পাদনের জন্য মসজিদে প্রবেশ বাধ্যতামূলক নয়। বিয়ে পড়ার সঙ্গে বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের কোনো সম্পর্ক নেই।

তিনি বলেন, একই সময় যদি চারটি বিয়ের অনুষ্ঠান হয় তাহলে একজন কাজি যে কোনো একটি বিয়েতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। অন্য বিয়েগুলো ইমাম দ্বারা পড়িয়ে নেয়া হয়। পরে কাজি গিয়ে সেই বিয়ের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করবেন। এটাই নিয়ম।

জানতে চাইলে ফুলবাড়ি উপজেলার বর্তমান সাব-রেজিস্ট্রার মোমেনুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না। আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বলতে পারবেন।

জানতে চাইলে ফুলবাড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দিন বলেন, একজন মানুষের অধিকার রয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়া। তিনিও সেখানে গেছেন। আদালত উনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

নারী নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়ার জন্য রিটকারী নারী আয়েশা সিদ্দিকা আবারও উচ্চ আদালতে রিটের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, নারী বিবাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) হতে শেষ পর্যন্ত তিনি আইনি লড়াইসহ প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চান। তিনি ৮ মার্চ নারী দিবসে তার পক্ষে দেশের জনগণের সমর্থন চান।

আদালতে রুল খারিজের বিষয়ে তিনি বলেন, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের জন্য নিকাহ রেজিস্ট্রারের প্রয়োজন নেই। নিকাহ রেজিস্ট্রার ফরমে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, বরের স্বাক্ষর আলাদা, কনের স্বাক্ষর আলাদা, সাক্ষীদের স্বাক্ষর আলাদা, যিনি বিয়ে পড়াবেন তার স্বাক্ষর আলাদা এবং রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর আলাদা। আমি তো নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে চেয়েছি, বিয়ে পড়াতে চাইনি। তাহলে এখানে প্রতিবন্ধকতা কোথায়?

আয়েশা সিদ্দিকা ১৯৯৬ সালে শহরের দারুস সুন্নাহ সিদ্দিকীয় ফাজিল (ডিগ্রি) কেন্দ্রীয় মাদরাসা থেকে দাখিল, ১৯৯৮ সালে আলিম এবং ২০০০ সালে ফাজিল পাস করেন। দাখিল পাস করার পর বিয়ে করেন তিনি। আয়েশার বাবা ছিলেন হোমিও চিকিৎসক। বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যে বাবা মারা যান। সেই থেকে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে সিদ্দিকীয় হোমিও হল চিকিৎসালয়ে সময় দেন।

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status