যিনি ‘হাসির ছটা’ দিয়ে ঢেকেছেন ‘অশ্রুজল’

বিজ্ঞাপন

আজ পঁচিশে বৈশাখ। বাংলা সাহিত্যের অনন্য প্রতিভা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬১তম জন্মদিন। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের এ দিনে কলকাতায় জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী বাংলার, বাঙালির চিরায়ত সাংস্কৃতিক উৎযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও করোনার কারণে বরাবরের মতো আনন্দঘন পরিবেশে পালিত হবে না কবিগুরুর জন্মদিনের উৎসব। সার্ধশতবর্ষ পেরুনো মহাকবির জন্মতিথি এমন অচেনা ও অভাবনীয় রূপে আর আসেনি, যেমনটি ঘটলো বিশ সালে তেমনটি এই একুশ সালেও। তাই রবীন্দ্রনাথে কথায় রবীপ্রেম ধারণ করে অপেক্ষা থাকি আরেক মুক্ত ২৫ শে বৈশাখের।

রবীন্দ্রনাথ একাধারে কবি, কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, সংগীত রচয়িতা, সুরস্রষ্টা, গায়ক ও চিত্রশিল্পী। সৃষ্টিশীলতার সমান্তরালে তিনি ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি ও সমাজভাবনা সমানভাবেই চালিয়ে গেছেন। বিশ্বভারতী তার বিপুল কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কীর্তি।

রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছেন ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস, ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্য সংকলন। তদুপরি, তার মোট ৯৫টি ছোটগল্প এবং ১৯১৫টি গান যথাক্রমে ‘গল্পগুচ্ছ’ ও ‘গীতবিতান’ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২টি খণ্ডে ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের সময় পত্র-সাহিত্য ১৯ খণ্ডে ‘চিঠিপত্র’ সংকলনে ও অন্য চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর রচনা বিশ্বের প্রায়-সকল ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে।

এশিয়ার মধ্যে রবীন্দ্রনাথই প্রথম, যিনি ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলী কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার পান, যা বিশ্বসাহিত্যে বাংলা ভাষার গৌরবময় সম্মান বৃদ্ধি করে এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির আলোকচ্ছটা বিশ্বময় ছড়িয়ে দেয়।

বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ এতকিছুর পরেও শেষ জীবনে স্বকীয় নান্দনিক ভাবনায় সমৃদ্ধ করেছেন চিত্রকলাকেও। একাধিক চিত্রকর্মে তিনি রেখেছেন শিল্প-নন্দনের অনুপম দৃষ্টান্ত। শিল্পবোধের ক্ষেত্রেও তিনি স্বাতন্ত্র্যবোধ ও অনন্যতায় দীপ্ত।

গানে, লেখায়, কর্মে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছেন সৃষ্টির আলোয় আলোয় পরিপূর্ণ এক অনিন্দ্য জগৎ। জগতের আলো ও অন্ধকার, আনন্দ ও বিষাদ, মানুষ ও সমাজের নানা বিন্যাস তিনি অঙ্কন করেছেন কথায় ও সুরে। বাঙালি জীবনের অনেকাংশ জুড়েই রবীন্দ্রনাথের অবস্থান। আর বাংলা সাহিত্যের তিন মহাস্তম্ভের মধ্যমণি তিনি, যার অগ্রে মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং পশ্চাতে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে তিনি সম্মিলিত ভাবে নির্মাণ করেছেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সার্বভৌম আধুনিক দিগন্ত।

রবীন্দ্রসাহিত্য, বিশেষত রবীন্দ্রসংগীত বাঙালির কাছে আলোকবর্তিকা হয়ে দেখা দিয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর তার গানই (আমার সোনার বাংলা) বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়। এছাড়াও তার অনেক গান মুক্তিযুদ্ধের সময় অনুপ্রাণিত করেছিল বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের।

রবীন্দ্রভক্তরা মনে করেন, বাংলা ও বাঙালির অহংকার রবীন্দ্রনাথ। অসাধারণ সব সাহিত্যকর্ম দিয়ে তিনি বিস্তৃত করেছেন বাংলা সাহিত্যের পরিসর। তার সাহিত্যকর্ম, সঙ্গীত, জীবনদর্শন, মানবতা, ভাবনা-সবকিছুই সত্যিকারের বাঙালি হতে অনুপ্রেরণা দেয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মা সারদাসুন্দরী দেবী এবং বাবা বিখ্যাত জমিদার ও ব্রাহ্ম ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৭৫ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মা মারা যান। পিতা দেবেন্দ্রনাথ দেশ ভ্রমণের নেশায় বছরের অধিকাংশ সময় কলকাতার বাইরে থাকতেন। আর তাই তো ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হয়েও রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা কেটেছিল ভৃত্যদের অনুশাসনে।

শৈশবে রবীন্দ্রনাথ কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নরম্যাল স্কুল, বেঙ্গল একাডেমি ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেন। ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে অথবা বোলপুর ও পানিহাটির বাগানবাড়িতে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।

৮ বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। ১৮৭৮ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশ্যে তিনি ইংল্যান্ড যান। সেখানে তিনি ব্রাইটনের একটি পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন এবং পরে ১৮৭৯ সালে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে আইনবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।

প্রায় দেড় বছর ইংল্যান্ডে কাটিয়ে ১৮৮০ সালে কোনো ডিগ্রি না নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। ১৮৮৩ সালের ভবতারিণীর সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহিত জীবনে ভবতারিণীর নামকরণ হয়েছিল মৃণালিনী দেবী। জীবনের পাশাপাশি চলতে থাকে তার সাহিত্যচর্চা। ১৮৯১ সাল থেকে বাবার আদেশে নদিয়া, পাবনা, রাজশাহী ও উড়িষ্যার জমিদারি তদারকি শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ। কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে তিনি দীর্ঘসময় পার করেন।

১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ সপরিবারে শিলাইদহ ছেড়ে চলে আসেন বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের উপকণ্ঠে শান্তিনিকেতনে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পৌঁছে দিয়েছেন বিকাশের চূড়ান্ত সোপানে। বাংলা ভাষার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

জীবন ও কর্মের এতোটাই বিপুলতার মধ্যে তিনি মিশেছেন জন থেকে জনে। প্রেমে ও বিরহে আকণ্ঠ পান করেছেন জীবনের সবটুকু সুধা। জন্মের আনন্দকে সৃষ্টি ও নির্মাণের স্রোতে ছড়িয়ে দিয়েছেন বাংলার, বাঙালির জীবনের সর্বব্যাপ্ত অঙ্গনে। ব্যক্তিগত দুঃখ-যাতনাকেও আত্মস্থ করেছেন অন্তর্গত নিভৃতিতে এবং শোকে ও বিষাদে আত্মমগ্ন হয়েও, সুতীব্র বেদনার জল ছুঁয়েও, বিনির্মাণ করেছেন বর্ণময় সৃজনের আভায় রাঙানো এক নান্দনিক ভুবন।

রবীন্দ্রনাথের অসামান্য ও অননুকরণীয় কৃতিত্ব হলো ‘দুখের তিমিরে’ তিনি জ্বালিয়েছেন ‘মঙ্গল আলোক’, ‘হাসির ছটা’ দিয়ে ঢেকেছেন ‘অশ্রুজল’। কর্ম ও সৃষ্টির হিমালয়তুল্য বিশালতায় গৌরবান্বিত করেছেন জীবনকে। জীবনের সকল অপ্রাপ্তি, বিষাদ ও বেদনাকে রূপান্তরিত করেছেন প্রাপ্তি, সৃষ্টি ও নির্মাণের আলোকময়-আনন্দযজ্ঞে।

এবারের আয়োজন: 

দেশে বর্তমানে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে কবির জন্মদিন উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে তেমন কোনো আয়োজন হচ্ছে না। তবে সরকারি ও বেসরকারি বেতার-টেলিভিশনে কবি স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। উল্লেখযোগ্যভাবে ছায়ানট রবীন্দ্রনাথের এবারের জন্মদিনে ‘ধর নির্ভর গান’ শীর্ষক একটি ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status