রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জীবনানন্দের ঘোড়া সমাচার

হেলাল আহমেদ

বিজ্ঞাপন

কালো অশ্ব , অন্তরে যে সারারাত্রি ফেলেছে নিঃশ্বাস
সে আমার অন্ধ অভিলাষ।

ও যেন রে যুগান্তের কালো অগ্নিশিখা,
কালো কুজ্জ্বটিকা।
অকস্মাৎ নৈরাশ্য আঘাতে
দ্বার মুক্ত পেয়ে রাতে
দুর্দাম এসেছে বহিরিয়া…

এ অমাবস্যায়
বল্গাছাড়া কালো অশ্ব ঊর্ধ্বশ্বাসে ধায়
কালো চিন্তা মন
আত্মঘাতী ঝঞ্ঝাসম
বিস্মৃতির চির বিলুপ্তিতে
চলে ঝাঁপ দিতে।

কালো ঘোড়া : বিচিত্রিতা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

হিন্দুশাস্ত্র ‘বেদে’ ঘোড়াকে গ্রহণ করা হয়েছে ‘প্রাণের প্রতিমূর্তি’ হিশেবে।স্নায়বিক শক্তি ও শ্বাসপ্রশ্বাসসহ যে প্রাণ প্রবহমান সেই প্রবহমান প্রাণকে ঘোড়ার মধ্য দিয়ে মূর্ত করে তোলা হয়েছে ‘বেদে’। ঘোড়াকে করে তোলা হয়েছে জীবনপ্রতিক। তাই এই ঘোড়া নামক প্রাণীটির অস্তিত্ব পাওয়া যায় রবি ঠাকুর এমনকি জীবনানন্দ দাশের কবিতায়ও। তবে প্রত্যেকে যার যার নিজস্ব কল্পনা এবং অভিজ্ঞতার বিচারে নিজেদের লেখার নিয়ে এসেছেন এ ঘোড়াকে।

উপরের কবিতায় (কালো ঘোড়া : বিচিত্রিতা) রবীন্দ্রানাথ ঠাকুর যে কালো ঘোড়ার কথা বলেছেন সেই ঘোড়ার সৃষ্টিকর্তা কবির কল্পনা। কবি রবীন্দ্রনাথের কল্পনার এই ঘোড়াকে তিনি পাঠকের সামনে হাজির করেছেন একটি অশুভ চেতনা বা কালো শক্তি রূপে। অবচেতনার অভ্যন্তরে যে অন্ধ অভিলাষ জড়ো হতে হতে একজন মানুষের আগাগোড়াকে জঞ্জালে পরিপূর্ণ করে দেয় অন্ধ অভিলাষরূপী সেই কালো ঘোড়াকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাইরে এনে মানুষের মনকে বিশুদ্ধ করে তোলতে আগ্রহী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের মনের এই কালো শক্তি (কালো ঘোড়া) বাইরে এনে দিয়েই স্বস্তি ফেলেছেন এবং একই সাথে আমাদেরও স্বস্তি দিয়েছেন। কেননা অশুভ চেতন বা কালো শক্তি মানুষকে কিভাবে পরিবর্তন করে সে আমাদের সকলেরই জানা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর এই ঘোড়ার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় জীবানানন্দ দাশের কবিতায়ও। তবে রবীন্দ্রনাথের ঘোড়ার সাথে জীবনান্দের ঘোড়ার বিস্তর তফাৎ রয়েছে। কেননা জীবানানন্দ দাশের ‘প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন- এখনও ঘাসের লোভে চরে/পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর প’রে’। জীবানন্দের ঘোড়া আমাদেরকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘোড়ার মতো শেষমেশ কোনো স্বস্তি কিংবা সন্তোষ কিছুই এনে দেয় না, কিন্তু ভাবায় অনেক। ভিন্নরকম এক চিন্তার খোড়াক দিয়ে যায় আমাদের মস্তিষ্কে। জীবনানন্দ দাশের ঘোড়া আমাদের চিরচেনা বাস্তবকে আক্রমণ করে। প্যারাফিন লণ্ঠন নিভে যাওয়ার পর প্রস্তরযুগ থেকে এই আধুনিক যুগে এসে তাঁর রহস্যময় ঘোড়াটি সময়সচেতন কিনা তাও আমাদের ভাবিয়ে তোলে ক্রমশ।

আমরা যাইনি মরে আজও তবু- কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয় :
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জোছনার প্রান্তরে,
প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন- এখনও ঘাসের লোভে চরে
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর প’রে।
আস্তাবলের ঘ্রাণ ভেসে আসে একভিড় রাত্রির হাওয়ায়;
বিষণ্ণ খড়ের শব্দ ঝ’রে পড়ে ইস্পাতের কলে;
চায়ের পেয়ালা কটা বেড়ালছানার মতো – ঘুমে – ঘেয়ো কুকুরের
অস্পষ্ট কবলে
হিম হয়ে নড়ে গেল ওপাশের পাইস রেস্তরাঁতে;
প্যারাফিন লণ্ঠন নিভে গেল গোল আস্তাবলে।
সময়ের প্রশান্তির ফুঁয়ে
এইসব ঘোড়াদের নিওলিথ- স্তব্ধতার জোছনাকে ছুঁয়ে।

ঘোড়া : সাতটি তারার তিমির
জীবনানন্দ দাশ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ভিতরের কালো ঘোড়াটিকে বাইরে এনে স্বস্তি বোধ করলেও বা আমাদেরকে স্বস্তি দিলেও জীবনানন্দ তা করেন নি। বরং জীবানন্দের ‘এইসব ঘোড়াদের নিওলিথ- স্তব্ধতার জোছনাকে ছুঁয়ে’ যায়। এখানেই রবীন্দ্রনাথের কালো ঘোড়ার সাথে জীবনানন্দের ঘোড়াগুলোর পার্থক্য। জীবানানন্দ দাশের ঘোড়া সময়সচেতন। এই ঘোড়া সময়ের সাথে হেঁটে হেঁটে সেই প্রস্তরযুগ থেকে এসে পৌঁছেছে আধুনিক যুগেও। এ পর্যন্ত এসেও থামেনি তাঁর পথচলা। হেঁটে যাবে ভবিষ্যতের দিকেও। হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ পরিণামও দেখিয়ে দেবে জীবনানন্দের এই ঘোড়া।

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status