লকডাউনে শ্রমিকদের দুর্বিষহ জীবন

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব মহামারি করোনায় চলমান লকডাউনে চরম মানবেতন জীবনযাপন করছেন দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, দোকানদার, ফুটপাতের ব্যবসায়ী, গাড়ি ও রিকশাচালকরা। কাজ হারিয়ে তারা এখন ঘরবন্দি। চাকরি নেই পোশাক ও শিল্পকারখানার অনেক শ্রমিকের।

শনিবার (১ মে) এমন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন ‘মে দিবস’ পালিত হয়েছে।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাপড ইন বাংলাদেশ এর (এমআইবি) প্রকল্প সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৫০ শতাংশের বেশি কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে।

চাহিদা কমে যাওয়ায় কারখানাগুলোতে শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। অনেক কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। কর্মী ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধের ক্ষেত্রে বেশিরভাগই বকেয়া বেতন ও ক্ষতিপূরণ পরিশোধের নিয়ম মানেনি।

জানা গেছে, সীমিত পরিসরে যেসব পোশাক ও শিল্পকারখানার খোলা রয়েছে সেখানে কর্মরত শ্রমিকরাও আছেন চাকরি হারানোর শঙ্কায়। করোনাকালে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা।

দৈনিক মজুরী ভিত্তিতে নিয়োজিত আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও হোটেল-রেস্টুরেন্টের অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। দোকানগুলো থেকেও হয়েছে কর্মী ছাঁটাই। কিছু ভাসমান দোকানি শহর ছেড়ে চলে গেছেন গ্রামে।

দিশেহারা বাস শ্রমিকরা

এবার করোনা পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবহনশ্রমিকেরা। এক মাস ধরে যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ আছে। এই খাতে কাজ করেন প্রায় ৭০ লাখ শ্রমিক। এর বাইরে ইমারত নির্মাণ ও সরকারের বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজও করোনার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে কাজ হারাচ্ছেন শ্রমিকেরা। অনেক ভাসমান ক্ষুদ্র দোকানি রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন। ফলে তাদের জীবনও অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে কৃষি খাতে আছেন ২ কোটি ৩০ লাখ ৪৮ হাজার নারী-পুরুষ। এখন বোরো মৌসুম চলছে। কিন্তু যানবাহন চলাচল বন্ধ আছে বলে এক অঞ্চলের শ্রমিক অন্য অঞ্চলে গিয়ে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন না।

শিল্প খাতে ১ কোটি ১১ লাখ ৬৮ হাজার মানুষ কাজ করে। আর সেবা খাতে আছে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ। শিল্পকারখানা কিছুটা চালু থাকলেও সেবা খাত করোনার কারণে ভালোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাজধানীর কামরাঙ্গিচর এলাকার ভলগেনাইজিং শ্রমিক মইন উদ্দিন খুলনা থেকে ঢাকা এসেছিলেন কাজের সন্ধানে। সবকিছু ঠিকমতো চলায় দুই বছর আগে পরিবারকেও নিয়ে আসেন নিজের কাছে। এর মধ্যে এসে করোনা তাদের বিদ্ধস্ত করে দিয়েছে। গত বছর লকডাউনের কারণে টানা ৬ মাস কর্মহীন ছিলেন তিনি। তারপর কাজ কিছুটা চলতে থাকলেও এবারের লকডাউনে আবারও বিপাকে পড়েছেন তিনি।

সংবাদ২৪-কে তিনি বলেন- গত লকডাউনে কাজ না থাকায় মহাজনের থেকে ও বন্ধুদের থেকে ঋণ এনে পরিবার চালিয়েছি। যখন কিছু কাজ করে ঋণ মারতে শুরু করলাম তখন আবার লকডাউনে সব বন্ধ। এক দিকে ঋণের চাপ আর অন্যদিকে পরিবারের মুখে দু’মুটো ভাত তুলে দেয়ার লড়াই। সামনের দিন কিভাবে চলবে জানি না। এলাকায় ফিরে গিয়ে কিছু করার নেই। না খেয়ে মরতে হবে।

পোশাক শ্রমিক

একই অবস্থা পোশাক শ্রমিক আলেয়ার। আশুলিয়ায় তার সাথে কথা হয় সংবাদ২৩-এর। তিনি জানান- গত বছর লকডাউনে চাকরি হারিয়েছেন। তার পাওনা টাকা এখনও পরিশোধ করেনি গার্মন্টস কর্তৃপক্ষ। স্বামী চা-সিগারেট ফেরি করে যা টাকা আয় করছেন তাতেই চলছে তাদের সংসার।

একসময়ের সুখের ও স্বাচ্ছন্দ্যের সংসার ছিল তাদের এমনটা জানিয়ে তিনি আক্ষেপ করেন।

এ ব্যাপারে শ্রমিক নেতা অরবিন্দু দাশ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এমন পরিস্থিতির জন্য তিনি সরকারকে দায়ী করে বলেন- যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন না করে লকডাউন দেয়ার ফলে শ্রমিকরা না খেয়ে আত্মহত্যা পর্যন্ত করছেন। সারা দেশে লাখ লাখ নিম্ন আয়ের শ্রমিকরা মানবেতরে জীবনযাপন করছেন। সরকার মালিকদের প্রণোদনা দিয়েছে কিন্তু শ্রমিকদের তা না দিয়ে মালিকরা পকেটে নিয়ে বসে আছেন। সাধারণ মানুষকে ভাতার ব্যবস্থা করা না গেলে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে।

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status