সত্যজিৎ রায়ের ‘মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্প’

বিজ্ঞাপন

১.
গায়ের লোকে একদিন ঠিক করলো নাসিরুদ্দিন মোল্লাকে নিয়ে একটু মশকরা করবে। তারা সবাই তার কাছে গিয়ে সালাম ঠুকে বললে, ‘মোল্লা সাহেব, আপনার এতো জ্ঞান, একদিন মসজিদে এসে আমাদের তত্বকথা শোনান না!’ নাসিরুদ্দিন গায়ের লোকেদের কথায় রাজি হয়ে গেলেন।
দিন ঠিক করে ঘড়ি ধরে মসজিদে হাজির হয়ে নাসিরুদ্দিন উপস্থিত সবাইকে সেলাম জানিয়ে বললে, ‘ভাই সকল, বলোতো দেখি আমি এখন তোমাদের কী বিষয়ে বলতে যাচ্ছি?’
সবাই বলে উঠলো, ‘আজ্ঞে সে তো আমরা জানিনা।’
তখন নাসিরুদ্দিন মোল্লা বললে, ‘এটাও যদি না-জানো তাহলে আর আমি কী বলবো। যাদের বলবো তারা এতো অজ্ঞ হলে চলে কী করে?’ এই বলে নাসিরুদ্দিন গজগজ করতে করতে মসজিদ ছেড়ে সোজা বাড়ি চলে গেলো।

এদিকে গায়ের লোক নাছোড়বান্দা। তারা আবার নাসিরুদ্দিন মোল্লার বাড়িয়ে গিয়ে হাজির।
‘আজ্ঞে, আসছে শুক্রবার আপনাকে আরেকটিবার মসজিদে আসতেই হবে।’
নাসিরুদ্দিন গেলো, আর আবার সেই প্রথমদিনের প্রশ্ন দিনেই শুরু করলো। এবার সব লোক একসঙ্গে বলে উঠলো, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, জানি।’
‘সবাই জেনে ফেলেছো? তা হলে তো আমার আর কিছু বলার নেই’- এই বলে নাসিরুদ্দিন আবার বাড়ি ফিরে গেলো।

গায়ের লোকও ছাড়ার পাত্র নয়। তারা আবারও নাসিরুদ্দিন মোল্লার কাছে গিয়ে হাজির হলো। পরের শুক্রবার মোল্লা আবার মসজিদে হাজির হয়ে তার সেই প্রথম প্রশ্নটি করলো, ‘ভাই সকল, বলোতো দেখি আমি এখন তোমাদের কী বিষয়ে বলতে যাচ্ছি?’ এবার আর মোল্লাকে রেহাই দেবে না গাঁয়ের লোক, তাই তাদের মধ্য থেকে অর্ধেকে বললো ‘জানি’, অর্ধেক বললো ‘জানি না’।
‘বেশ তাহলে যারা জানো তারা বলো, আর যারা জানো না তারা শোন’- এই বলে নাসিরুদ্দিন আবার ঘরমুখো হলো। গ্রামবাসী আর নাসিরুদ্দিন মোল্লাকে নিয়ে মশকরা করতে পারলো না।

২.
নাসিরুদ্দিন একবার ভারতবর্ষে এসে এক সাধুর দেখা পেয়ে ভাবলেন, ‘আমার মতো জ্ঞানপিপাসু ব্যক্তির পক্ষে সাধুর সাক্ষাত পাওয়া পরম সৌভাগ্য। এর সঙ্গে আলাপ না-করলেই নয়।’ তাঁকে জিজ্ঞেস করলে সাধু জানান তিনি একজোন যোগী; ঈশ্বরের সৃষ্ট যতো প্রাণী আছে সকলের সেবাই তার ধর্ম।
নাসিরুদ্দিন যোগীর কথা শুনে বললো, ‘ঈশ্বরের সৃষ্ট একটি মৎস একবার আমাকে মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা করেছিলো।’
এ-কথা শুনে যোগী আহ্লাদে আটখানা হয়ে বললেন, ‘আমি এতো দীর্ঘকাল প্রাণীর সেবা করেও তাদের এতো অন্তরঙ্গ হতে পারি নি। একটি মৎস আপনার প্রাণ রক্ষা করেছে শুনে এই দেখুন আমার রোমাঞ্চ হচ্ছে। আপনি আমার সঙ্গে থাকবেন না তো কে থাকবে?’

নাসিরুদ্দিন যোগীর সঙ্গে থেকে তার কাছ থেকে যোগের নানা কসরত শিক্ষা নিলেন। শেষে একদিন যোগী নাসিরুদ্দিন মোল্লাকে বললো, ‘আর ধৈর্য রাখা সম্ভব নয়। অনুগ্রহ করে যদি সেই মৎসের উপাখ্যানটি শোনান।’
‘একান্তই শুনবেন?’
‘হে গুরু!’ বললেন যোগী, ‘শোনার জন্য আমি উদ্গ্রীব হয়ে আছি।’
‘তবে শুনুন’, বললো নাসিরুদ্দিন, ‘একবার খাদ্যাভাবে প্রাণ যায় যায় অবস্থায় আমার বড়শিতে একটি মাছ ওঠে। আমি সেটা ভেজে খাই।’

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status