স্বাধীনতা সংগ্রামী এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর গল্প

বিজ্ঞাপন

প্রথম পর্ব::

তখন তিনি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কাজেম আলী স্কুলের ছাত্র। এসএসসি পরীক্ষার্থী। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা -‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।—এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণের দীপ্ত সাহসিকতা ভর করলো সেই এস এস সি পরীক্ষার্থী কিশোরের বুকে। জীবন বাজি রেখে পাড়ি জমালেন সীমান্ত। প্রশিক্ষণ নিলেন গেরিলা বাহিনীর। কলম ধরার কচি হাতে শত্রু নিধনের মরণাস্ত্র নিয়ে দেশে ফিরলেন মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা বাহিনীর একটি প্লাটুনের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে। জানিনা এতো অল্প বয়সী প্লাটুন কমান্ডার আর ছিল কিনা।

স্বাধীনতা যুদ্ধ জয়। সাথে সাথে শুরু জীবন যুদ্ধ। ছাত্র জীবনে ফিরে গেলেন বটে,কিন্তু জীবন যুদ্ধ সাথে নিয়ে। ছোট সরকারি চাকুরে বাবার অবসর গ্রহণ। এইচ এস সি পরীক্ষার আগেই নিতে হয় বাবা, প্রায় অসুস্থ মা,ছোট দুইভাইসহ পাঁচ সদস্যের এক পরিবারের দায়িত্ব। সত্তরের ডিসেম্বরে একমাত্র বোনের বিয়ে হয়ে যায় । মা শারীরিক অসুস্থ হওয়ায় সাংসারিক ঘরোয়া দায়িত্বের জন্য বাবার নির্দেশে নিজের অমতে বিয়েও করতে হয় । অনেক চেষ্টায় শ্রমিকের চাকুরি পান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ এ। পাশাপাশি বড় দারোগাহাটে ছোটখাটো ব্যবসা। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ । অনেক কষ্টে নির্বাহ করেন সংসার। নিজের সুখ নিয়ে খুব ভাবতেন না। মা-বাবা, ভাইদের নিয়ে সংসারই ছিল ভাবনার মুখ্য বিষয়। তার সাথে সাথে সমাজকর্ম, সাংস্কৃতিক কর্ম,ট্রেড ইউনিয়ন,জাতীয় রাজনীতি। হয়ে ওঠলেন একজন জনপ্রিয় সমাজকর্মী, ভালো ট্রেড ইউনিস্ট। হিতৈষী যেমন জুটলো অনেক, হিংসুক একটা দলও জ্বলতে শুরু করলো।

পঁচাত্তর পরবর্তী বৈরী সময়। হিংসুকের দল এবং যুদ্ধ পরাজিত শক্তি; দু’দিক থেকেই চেষ্টা কীভাবে সিঁড়িটা কেড়ে নেওয়া যায়, ভেঙে দেওয়া যায়,স্তব্ধ করে দেওয়া যায় সন্মুখ যাত্রা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অপ্রতিরোধ্য তরুণ প্লাটুন কমান্ডার জীবন যুদ্ধেও নির্ভীক দুঃসাহসী, অকুতোভয়ই চ্যালেঞ্জার। সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন সাহসিকতার সাথে। হিংসুকের দল,পরাজিত শক্তি মরমে জ্বলেছে, হয়তো আজো। কিন্তু কমান্ডার দীপ্ত শক্তিতে তাঁর বাহিনী নিয়ে ষণ্মুখে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। যতক্ষণ নিঃশ্বাস ছিল ততক্ষণ যুদ্ধের নেতৃত্বে। স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জীবন যুদ্ধেও বিজয়ী বীর। হেরে যাওয়া, হতাশা যাঁর অভিধানেই ছিল না। যিনি দিয়েছেন উজাড় করে,নেওয়া বোধহয় ওনার স্বভাবেই ছিল না। যারা ওনার যাত্রা পথ কণ্টকাকীর্ণ করতে চেয়েছে তাদের অনেকেরই যাত্রাপথ মসৃণ করেছেন তিনি নিজে।

তিনি আলী আকবর ভূঁইয়া, আমার পিতৃতুল্য বড়দা,যাঁর সকল যুদ্ধ জয়ের বেনিফিসিয়ারি আমি। গত বছরের সাত মে, চব্বিশ বৈশাখ, পহেলা রমজান মঙ্গলবার সকাল ১১:৩৫ টায় ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যাঁর বর্ণাঢ্য সংগ্রামী চ্যালেঞ্জিং জীবনের অবসান ঘটিয়ে নিয়তির চিরায়ত নিয়মে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। বিনম্র শ্রদ্ধা হে অপ্রতিরোধ্য,অশুর বিনাসের দুঃসাহসী কমান্ডার । আপনার জীবন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ সুফলভোগী আমরা এবং অসংখ্য মানুষের জীবনে আপনার যে অবদান তাদের আন্তরিক ভালবাসা আপনার পরজীবন সহজ,সুন্দর, সাবলীল হবে নিশ্চয়। (চলবে…)

লেখক: ফারুকী রুহুলআমিন, মুক্তিযোদ্ধা আলী আকবর ভূঁইয়ার ছোট ভাই।

 

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status