ধেয়ে আসা মন্দায় কৃষিই হোক বাংলাদেশের ভিত্তি

বিজ্ঞাপন

করোনা মহামারী চলছে দুনিয়াজুড়ে। বাংলাদেশেও। আগামী সপ্তাহেই মৃত্যুসংখ্যা সোয়া দুই লাখ ছোঁবে। বাংলাদেশেও দুইশো পার হবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। সারা দুনিয়াজুড়ে লকডাউন। অর্থনৈতিক সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ। শিল্পোৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, যোগাযোগ, যাতায়াত, পর্যটন, অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা ইত্যাকার অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের সিংহভাগই বন্ধ।

বাংলাদেশে সীমিত আকারে তৈরি পোশাক শিল্পে উৎপাদন শুরু হলেও অন্যান্য শিল্পের অধিকাংশই বন্ধ। ব্যাংকিং চলছে সীমিত পরিসরে। আন্তর্জাতিক যাতায়াতের মতো অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের সকল পথ রুদ্ধ। নিত্যপণ্যের বাজার সীমিত আকারে চলছে, কিন্তু অন্যান্য বাজারের দরজা রুদ্ধ। পর্যটন বন্ধ। জরুরি সরকারি দপ্তরগুলো খোলা থাকলেও অধিকাংশই এখনও বন্ধ।

গেলো ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি শুরু হয়ে ইতোমধ্যেই এক মাস অতিক্রম করেছে।এমন স্থবির পৃথিবীর দেখা এ যাবৎকালে মেলেনি। কেবল একটা কাজ এক দিনের জন্যও থেমে নেই- বাংলাদেশের কৃষি। বরং বোরো ধান উঠতে শুরু করেছে। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত ধানই উঠে যাবে কৃষকের ঘরে। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এবারও বোরোর বাম্পার ফলন বাংলাদেশকে আশা যোগাচ্ছে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মোট ভূমির পরিমাণ যা ছিলো, ছিটমহলের সামান্য হিসাব বাদ দিলে মোটের উপর এই পঞ্চাশ বছর পরে এসেও তাই আছে। বরং সে সময়কার সাড়ে সাত কোটি মানুষ বেড়ে এখন আনুমানিক ১৭ কোটি হয়েছে। উল্টো মানুষ বৃদ্ধির ফলে আবাসন, শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং যোগাযোগ ও অন্যান্য অবকাঠামো স্থাপনের প্রয়োজনে কৃষি জমি কমেছে। এই পঞ্চাশ বছরে কৃষি জমি অর্ধেক কমেছে ধরে নিয়ে এবং মানুষ বৃদ্ধি সোয়া দুই গুণ ধরে নিয়ে হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে এই সময়ে কৃষি জমির বিপরীতে খাদ্য চাহিদা বেড়েছে সাড়ে চার গুণ।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশে খাদ্য ঘাটতি ছিলো চরমে এবং স্বাধীনতার বছর দুয়েকের মধ্যেই দেশ এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে পতিত হয়। বাংলাদেশের এই খাদ্য ঘাটতি মেটাতে সবসময়ই বিদেশের বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের দয়া-দাক্ষিণ্য এবং খাদ্য আমদানির উপর নির্ভর করে থাকতে হতো। এমন অবস্থা কমবেশি ৪০ বছর চলেছে। এই ৪০ বছরের সবসময় দুর্ভিক্ষ না হলেও খাদ্য ঘাটতি ছিলোই। খাদ্য আমদানি ছিলো আমাদের নিত্যকার বিষয়। এর উপর প্রাকৃতিক দুর্যোগ- বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি দুর্বিপাকে আমাদের খাদ্য সাহায্য ও অন্যান্য ত্রাণের জন্য পরদেশের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করতে হতো। কিন্তু গত এক দশক ধরেই বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। নিজেদের যা উৎপাদন তা দিয়ে অভ্যন্তরীণ খাদ্য চাহিদার পুরোটাই মেটানো যাচ্ছে। তবে আপৎকালীন মজুদের প্রয়োজনে সীমিত আকারে কিছু খাদ্য আমদানি অব্যাহত আছে।

এবারের করোনা দুর্যোগে যে পরিমাণ মানুষ কর্মহীন হয়ে ঘরবন্দী অবস্থায় আছেন, তাদের যে একটা বড় অংশকে সরকারি ভর্তুকিতে খাদ্য সাহায্য বা অন্যান্য ত্রাণ দিতে হচ্ছে এবং অবস্থার বিবেচনায় আরো অন্তত কয়েকমাস দরিদ্র শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষকে খাদ্য ও ত্রাণ সাহায্য দিতে হবে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। এখন কিন্তু এই ত্রাণের জন্যও বাংলাদেশকে আর বিদেশি সাহায্যের মুখাপেক্ষী থাকতে হচ্ছে না। সরকারের বাইরেও প্রচুর বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে দরিদ্র মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এই সূচকটাও বেশ আশাপ্রদায়ক। ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত উদ্যোগে এই যে খাদ্য সহায়তা করা হচ্ছে- এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, দেশে সামর্থ্যবান মানুষের সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে।

আগেই বলেছি, পঞ্চাশ বছরে কৃষিজমির বিপরীতে খাদ্য চাহিদা বৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে চার গুণ। কিন্তু তখন দেশে দুর্ভিক্ষসহ খাদ্য ঘাটতি নিয়মিত হলেও গত এক দশকে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। এমনকি সীমিত পরিসরে বাংলাদেশ খাদ্যশস্য রপ্তানিও করেছে। ২০১৫ সালে নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের সময় বাংলাদেশ তাদের ১০ হাজার টন চাল উপহারও দিয়েছে। এই যে খাদ্যঘাটতি পূরণ হলো- এটা কোন জাদুমন্ত্রবলে? নিঃসন্দেহে এর প্রধান উৎসব আমাদের কৃষি। আমাদের আগে যেখানে বছরে এক ফসল হতো, সেখানে তিন ফসল হচ্ছে। আগে কাঠাপ্রতি যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হতো, এখন উচ্চ ফলনশীল বিভিন্ন জাত উৎপাদনের ফলে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি উৎপাদন হয়। কেবল ধানই নয়, অন্যান্য ফসল, শাকসবজী, প্রাণীজ কৃষি এবং মাছের উৎপাদনও বেড়েছে। দেশে নদীনালা সহ প্রাকৃতিক জলাশয় আমরা অবহেলায় ধ্বংস করেছি। কিন্তু তা সত্বেও এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মাছের চাহিদা পূরণ হচ্ছে নিয়মিতই। প্রাণীজ কৃষি তথা মুরগী, হাঁস, ডিম, গবাদি পশু তথা দুধ ও মাংসের উৎপাদনও আশাব্যঞ্জক হারে বেড়েছে।

দেশের এই মৌলিক পরিবর্তনের প্রধান উৎস আমাদের কৃষি। আর এই নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের মূল কারিগর আমাদের কৃষকরা। আমাদের ধান গবেষণা কেন্দ্র, কৃষি গবেষণা কেন্দ্রগুলো এ ক্ষেত্রে দারুণ কাজ করেছে। আর মাঠের বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেছেন আমাদের কৃষকরাই। এই কৃষি ও কৃষকের উপর ভর করেই বাংলাদেশের অন্যান্য ক্ষেত্রের প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে। এবং আজকের বাংলাদেশ কৃষি ও অন্যান্য শিল্প-বাণিজ্য, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পথ ধরে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। গত এক যুগে বাংলাদেশে উন্নয়নের পথে অভিযাত্রাকে শত্রুও অস্বীকার করতে পারবে না।

কিন্তু এই উন্নয়নের ফসল খাচ্ছে কারা? উন্নয়নের প্রধান কারিগর আমাদের কৃষক। কিন্তু উন্নয়নের ফসলের ভাগীদার অন্যরা। আমাদের কৃষকদের আর্থিক ও জীবনমানের অবস্থা আগের চেয়ে অনেক পাল্টে গেলেও নির্দ্বিধায় স্বীকার করতেই হবে- উন্নয়নের মূল সুবিধাভোগী তারা নন। দেশে উন্নয়ন যে হারে হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি হারে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে। উপরতলার মানুষের সাথে নিচের তলার মানুষের বৈষম্য অনেক বেশি প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে খালি চোখেই। আর এখনও পর্যন্ত কৃষি ও কৃষকই আমাদের উন্নয়নের ভিত্তি হলেও তারা এই বৈষম্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত।

আজকের করোনা পরিস্থিতি সেই সত্যকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। আবার একই সাথে এও বলে দিচ্ছে যে করোনা-পরবর্তীকালে ধেয়ে আসা অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা করতে কৃষি ও কৃষককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান ব্যতিরেকে বাংলাদেশের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। এই মন্দা যেহেতু বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলবে, তাই আমাদের অর্থনীতির কৃষি-পরবর্তী আর দুটো খাত, যথা- তৈরি পোশাক শিল্প ও প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স প্রবাহে মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। আর গভীরভাবে ভাবলে এটা নিঃসন্দেহে আমাদের স্বীকার করতে হবে- যে তৈরি পোশাক শিল্প নিয়ে আমরা এতো স্বপ্ন রচনা করছি, তা কোনোক্রমেই আমাদের মৌলিক শিল্প নয়। কারণ এই কাঁচামাল বিদেশ থেকে এনে তৈরির কাজটা আমরা করে আবার বিদেশে রপ্তানি করা ছাড়া আমাদের কার্যত আর কোনো ভূমিকা নেই।

প্রকৃতপক্ষে তৈরি পোশাক শিল্প আমাদের ইউরোপ-আমেরিকার দর্জিগিরি বৈ কিছু নয়। এ খাতের মালিকরা দর্জিবাড়ির ঠিকাদার ছাড়া আদতে কোনোভাবেই শিল্পোদ্যোক্তা নন। ফলে করোনা-পরবর্তী সময়ে উন্নত বিশ্বও যখন মন্দায় ভুগবে, তখন তারা বিলাসী পোশাক ব্যবহার কমাবে, ফলে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পের চাহিদা কমবে, আয় কমবে, বিরাট অংশের শ্রমিক বেকার হবেন।

আমাদের অর্থনীতির আরেক ভিত্তি প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। সেখানেও আমরা ইতোমধ্যে ধাক্কা খেয়েছি। লক্ষ লক্ষ প্রবাসী শ্রমিক করোনার ধাক্কায় বিদেশ থেকে ফেরত এসেছেন এবং আরো কয়েক লক্ষ ফেরত আসার অপেক্ষায় আছেন। করোনা-পরবর্তীকালে বৈশ্বিক মহামন্দার ঢেউয়ে এই প্রবাসী শ্রমিকদের একটা বড় অংশই কাজ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। এমনকি যারা দেশে এসেছেন, তাদের অনেকেই আদতে আবার ওইসব দেশে গিয়ে কাজে যুক্ত হতে পারবেন কিনা বা আদৌ তারা আবার যেতে পারবেন কিনা তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ফলে পরনির্ভর এই দুটো খাত দিয়ে আমরা এতোকাল যে স্বপ্নের সৌধ নির্মাণ করে এসেছি, তা প্রকৃতপক্ষে বালির উপর গড়া ভিত ছিলো। তাই আসছে বৈশ্বিক মহামন্দায় আমাদের বাঁচতে হলে কৃষি ও কৃষকের উপরই আরো বেশি ভর করতে হবে। তাদেরকেই সর্বোচ্চ প্রণোদনা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

কিন্তু এই দুর্যোগেও কৃষি ও কৃষকের বাস্তব অবস্থা কী?আসুন, কিছু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের দিকে আগে চোখ বুলিয়ে নিই।

বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে এবারও। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের ধান উৎপাদন সারাদেশে  দুই কোটি টন ছাড়িয়ে যাবে। ধান কাটার ক্ষেত্রে কৃষককে বেশকিছু সহযোগিতা রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবীদের তরফ থেকে করা হচ্ছে। যতদূর জেনেছি, আমাদের ধানের প্রধান উৎপাদনক্ষেত্র হাওড় এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে হারভেস্টর মেশিন পাঠানো হয়েছে। লকডাউনের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় বিশেষ ব্যবস্থাপনায় অন্যান্য এলাকা থেকে সেখানে ধান কাটার জন্য কৃষিশ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন বিশেষ করে ছাত্রলীগ সারাদেশে কৃষকদের ধান কাটার ক্ষেত্রে আন্তরিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। তারা স্বেচ্ছাশ্রমে কৃষকের ধান কেটে বাড়িতে তুলে দিচ্ছেন। এগুলো নিঃসন্দেহে আশার খবর। কিন্তু কতিপয় এমপি-মন্ত্রী-সরকার দলীয় নেতা যে শো-অফের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন, এমনকি ফেসবুকে প্রচারের নেশায় মেতে কৃষকের কাঁচাধানও কেটে দিয়েছেন টাংগাইলের এমপি ছোটমনির কিংবা জুতা পরেই ধান কাটতে নেমে গেছেন প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক কিংবা কতিপয় নারীনেত্রী দামি শাড়ি পড়ে ধানক্ষেতে নেমে ফটোশ্যুটে মেতেছেন- এসব লোকদেখানো কাজ করতে গিয়ে তারা ছাত্রলীগের আন্তরিক উদ্যোগকে যেমন ছোট করেছেন, তেমনই কৃষকের ওইসব জমির ধান কার্যত নষ্ট করেছেন।

কিন্তু ধান কেটে দেওয়া আসল সমাধান নয়। আসল সমাধান কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে খুব খারাপ। সরকার কৃষকের যে পরিমাণ ধান ন্যায্যদামে কিনে নেয়, এর বাইরে বাকি কৃষক কোনোভাবেই ন্যায্যদাম পাচ্ছেন না। ফড়িয়া, স্থানীয় টাউট বাটপার, নব্য রাজনৈতিক ধুরন্ধর, মিল ও চাতাল মালিক, মধ্যসত্বভোগী ব্যবসায়ী পারস্পরিক যোগসাজশে কৃষককে ঠকায়। এর উপর সরকারি ভাণ্ডারে কেনা হয় যে পরিমাণ ধান, তাও সবসময় প্রকৃত কৃষক বিক্রি করতে পারে না। পূর্বোক্ত দুর্বৃত্ত গোষ্ঠীর সাথে মিলে সরকারি গুদামের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কৃষকের ধান কার্যত লুট করে। আর এই দুর্বৃত্তগোষ্ঠীর সাথে যেহেতু স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বলয় মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে, তাই সেক্ষেত্রেও আসলে কৃষকের করার মতো কিছু থাকে না। ফলে কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য পায় না- এটাই বাংলাদেশের রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এবার অন্তত এই ঠগবাজির দুষ্টচক্র থেকে কৃষককে রক্ষা করতে সরকারি তথা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আরো বাড়ানো দরকার ছিলো। কিন্তু কী দেখছি? সারাদেশের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা যেখানে দুই কোটি টন, সেখানে সরকার ধান কেনার ঘোষণা দিয়েছে মাত্র ১৯ লক্ষ টন। অর্থাৎ মোট উৎপাদনের মাত্র ১০ শতাংশের মতো। তার মানে শুরুতেই ৯০ শতাংশ উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে কৃষক বঞ্চিত হয়ে গেলো। যদিও সরকারের এই ক্রয় লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের চেয়ে দুই লক্ষ টন বেশি। কিন্তু বিগত বছরগুলোর খারাপ নজির আর তার সাথে মিলে এবারের করোনা-মন্দা পরিস্থিতিতে এই ১৯ লক্ষ টন আসলে কিছুই না। এতে কোনোভাবেই কৃষকের সুরক্ষা মিলবে না।

যুক্তি দেওয়া যেতে পারে, এর বেশি ধান রাখার মতো সরকারি গুদাম অবকাঠামো নেই। কিন্তু তারও বিকল্প উপায় ছিলো। অস্থায়ী গুদাম, স্থানীয়ভাবে গুদাম ভাড়া করা, এমনকি কৃষকের উঠোনকেই শর্তসাপেক্ষে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করার কার্যকরী বিকল্প পন্থা চিন্তা করলে বের করা অসম্ভব ছিলো না। ফলে প্রধানমন্ত্রী কৃষি ও কৃষককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার যে কথা গত কয়েকদিন ধরেই তার বক্তৃতায় বলছেন, তা শুরুতেই উদ্যোগহীনতা ও পরিকল্পনার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়লো।

এখনও সময় আছে, সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে। সরকারি উদ্যোগে ক্রয় লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে প্রয়োজনে সকল ধান কিনে নিয়ে পরে রাষ্ট্রীয় বিতরণ  ও বিপণন ব্যবস্থাপনা তৈরি করা যেতে পারে। আজ এটা অনুধাবনের সময় এসেছে যে, সরকারের মজুদে ধান-চাল থাকলে বাজারের উপর জনভাগ্য ফেলে রাখার দরকার হবে না। বাজারের উপর ভাগ্য সমর্পণের কী ফল, তা তো আমরা এতোকাল দেখছি। আর কিছু না হোক, অন্তত কৃষিতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বাড়ানো গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে এখনই। কৃষক তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পেলে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান অনুসরণ করে প্রতি ইঞ্চি জমি চাষ করতে উৎসাহিত হবেন। আবার সরকারের মজুদে খাদ্যশস্য থাকলে বাজারের উপর তার নিয়ন্ত্রণ কার্যকরী হবে। ইচ্ছেমতো পণ্যমূল্য বাড়াতে পারবে না ব্যবসায়ীরা। অসাধু সিন্ডিকেটের অবসান হবে। শহরের নাগরিকও পণ্যভোগ করার ক্ষেত্রে ন্যায্যতা লাভ করবেন। এর পাশাপাশি কৃষকের কাছ থেকে সরকারের ধান কেনার ক্ষেত্রে যে দুর্নীতি ও ঠগবাজির চক্র ও অব্যবস্থাপনা আছে, কঠোর দৃষ্টি দিয়ে তার শতভাগ রোধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দুর্নীতির কারণে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রবৃদ্ধির একটা বড় অংশই কিন্তু বেহাত হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, দুর্নীতি যদি অর্ধেকও কমানো যেতো, তাহলে বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে আমাদের প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কে পৌঁছে যেতো। এই বিপর্যয়ের দিনে এসে অন্তত ধান কেনার ক্ষেত্রে দুর্নীতি শতভাগ রোধ করার কাজে গভীর মনোযোগ দিতে হবে। ধানের বাইরেও আরো যে ফসল কৃষক উৎপাদন করছেন, যেমন- হরেক রকমের সবজী, তার দাম কৃষক পাচ্ছেন না। এটাও নতুন কোনো উপসর্গ নয়, বিগত বছরগুলোতেও এমনই চলে আসছে। এখনই উপযুক্ত সময়, কৃষকের উৎপাদিত এসব পণ্যের যথাযথ বাজার ও বিপণন ব্যবস্থা সৃষ্টি করার। সরাসরি কৃষকের হাট বা এ জাতীয় ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সৃষ্টি করা যেতে পারে। গ্রাম থেকে এসব ফসল শহরের বাজারে আসার ক্ষেত্রে পথে পথে যে চাঁদাবাজি আর ফড়িয়াদের কয়েক স্তরে হাতবদলের বাণিজ্য ঘটে, তাকে কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করে শহরে সরাসরি কৃষকের বিপণন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তা নাহলে কৃষক যেমন ঠকবেন, অন্যদিকে শহরের নাগরিকরাও ওইসব ফসল কিনতে ঠকবেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই করোনাকালে কৃষি ও কৃষকের জন্য রাষ্ট্রীয় প্যাকেজ ও প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। নিঃসন্দেহে সেগুলো প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আর তার প্রায়োগিক পরিকল্পনার মধ্যে বিস্তর ফারাক থেকে গেছে। প্রধানমন্ত্রী কৃষি ও কৃষকের জন্য ৪% সুদহারে ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। খেয়াল করে দেখুন, ধনী তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য যেখানে ২% সুদহারে ঋণপ্যাকেজ, সেখানে গরিব কৃষকের জন্য সুদহার ৪%। এটা কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না। আবার এই ঋণ কারা পাবেন? প্রকৃত কৃষক পাবেন এর কতোটুকু?

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ঋণ বিতরণের নীতিমালা ঘোষণা করেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, ১৫ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিকরা জমির দলিল জমা দিয়ে আড়াই লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণসুবিধা পাবেন। কিন্তু কতো শতাংশ কৃষকের এ পরিমাণ জমি আছে। বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থার একটা বড় অংশই তো বর্গা চাষী বা মৌখিক চুক্তিভিত্তিক চাষী। এদের মধ্যে আরেক বড় অংশ আবার একেবারেই ভূমিহীন চাষী। এই বর্গাচাষী বা ভূমিহীন চাষীরা ঘোষিত ঋণ প্যাকেজের একটি টাকাও পাবেন না। অথচ এদের সংখ্যা এক কোটির কাছাকাছি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই নীতিমালায় আরো উল্লেখ রয়েছে, কৃষক নয় এমন যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কৃষকের উৎপাদিত ফসল কিনে বাজারজাত করবেন, তারাও ঋণপ্যাকেজের সুবিধা পাবেন এবং তাদের প্রাপ্য ঋণের পরিমাণ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত। আগেই যে কথা বলেছি, কৃষকের উৎপাদিত ফসল বাজারজাতের আগেই বেহাত হয়ে যায় দুর্বৃত্ত চক্রের হাতে। সেই দুর্বৃত্ত চক্রকেই ঋণপ্যাকেজের আওতায় এনে তাদের আলো ফুলেফেঁপে ওঠার সুযোগ করে দেওয়া হলো। অর্থাৎ, কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির স্বপ্ন এবারও বাস্তবায়ন হওয়ার কোনো সুযোগ থাকছে না। বরং মধ্যসত্বভোগী, মিল ও চাতাল মালিক, ফড়িয়াদের আরো পোয়াবারো।

মোটের উপর এই কৃষিঋণ প্যাকেজের সারকথা যা দাঁড়ালো, তা হচ্ছে- বর্গাচাষী বা ভূমিহীনরা মোটেই কিছু পাবেন না। কৃষক বা অকৃষক গ্রামীণ জমির মালিক পাবেন আড়াই লক্ষ টাকা পর্যন্ত। আর মধ্যসত্বভোগী ব্যবসায়ীরা পাবেন ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত। প্রণোদনার লক্ষ্য হওয়ার কথা ছিলো কার, আর সুবিধাভোগী হচ্ছে কে?

করোনাকাল ও করোনা-পরবর্তীকালের অর্থনৈতিক ভিত্তি হবে কৃষি, অন্তত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে- এ সত্য বুঝতে বাংলাদেশের আর সময় নেওয়া উচিত হবে না।

  • লেখক: প্রাক্তন ছাত্রনেতা; সাধারণ সম্পাদক, ইয়ুথ ফর ডেমোক্রেসি এন্ড ডেভেলপমেন্ট।

সংবাদ২৪-এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব।
প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে 
এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় 
কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়।
  • সংবাদ২৪-এর ‘খোলামত’ বিভাগে আপনিও লেখা পাঠাতে পারেন। লেখারগুণগত মান ও আমাদের সম্পাদকীয় নীতির আলোকে পর্যালোচনা করে আমরা তা প্রকাশ করবো। লেখা পাঠান newsroom@sangbad24.news এই ঠিকানায়।

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status