অর্থনীতিতে বাঙালি নারীদের মূল্যায়ণ ও সামাজিক মর্যাদা

বিজ্ঞাপন

নারী শব্দটি শুনলেই বাঙালির মাথায় একটাই বাক্য চেপে বসে ‘নারীরা মায়ের জাত’ । সন্তান উৎপাদন ছাড়া কি তবে নারীর আর কোনো কাজ নেই বা নারীর আর সক্ষমতা নেই কিংবা থাকতে নেই? আচ্ছা, এই সন্তান উৎপাদনে ও সংসারের কাজে নারীরা যা শ্রম ও মেধা ব্যয় করেন তার হিসেব আমাদের আছে? এ আবার হিসেবের বিষয় তা তো কোনোদিন ভেবে দেখিনি আমরা। কিন্তু তা হিসেব করলে অবাক হবেন যে আমাদের জিডিপির ২৮ শতাংশ অবদান রাখেন তারা সংসারের কাজের মধ্য দিয়ে। যার আনুমানিক মূল্য নির্ধারণ করলে হবে ৬ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা। যা কোনোদিন আমাদের সরকারী বা বেসরকারি হিসেবে উঠে আসেনি। কারণ আমরা নারীদের ‘মায়ের জাতি’ আখ্যা দিয়ে অর্থনৈতিক মূল্যায়ণের বাইরে রেখেছি।

পরিসংখ্যান বলছে, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নারীর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। তাও একজন নারী বছরে যত কাজ করেন, তার মাত্র ১৩ থেকে ২২ শতাংশের হিসাব। বাকি ৭৮ থেকে ৮৭ শতাংশ কাজের বিনিময়ে কোনো মূল্য পান না তারা। যেমন সংসারে নারীর কাজের কখনও কোনো মূল্য দেয়া হয়না, তাই এই হিসেবে আনা যায়নি। কিভাবে আনবে সংসারের কাজকে তো আমরা কখনও কাজই মনে করিনি তাহলে সেটার অর্থমূল্য কিভাবে নির্ধারণ করব?

বাংলাদেশের জিডিপির আকার প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা। জিডিপির যে ২০ শতাংশের হিসেব আমাদের কাছে আছে তার আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক খাতে মূল্য নির্ধারণ করলে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। আর হিসেবের বাইরে থাকা নারীদের ২৮ শতাংশ অবধানের অর্থমূল্যের হিসেব দাঁড়াবে ১১ লক্ষ ৫২ হাজার টাকা।

‘ রিয়ালাইজিং দ্য ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট ইন বাংলাদেশ প্রমোটিং ফিমেইল লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন’ গবেষণায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে দেশের নারীদের সংসারের ভেতর ও বাইরের কাজের মূল্য ধরলে জিডিপিতে তাদের অবদান বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ পুরুষদের প্রায় সমান অবধান নারীদের।

সংস্থাটি বলছে, গৃহস্থালিতে নারীর যে কাজ জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না, সেই শ্রমের প্রাক্কলিত বার্ষিক মূল্য (২০১৩-১৪ অর্থবছর) জিডিপির ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। গৃহস্থালি কাজে দেশের নারীর বছরে ব্যয় ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি ঘণ্টা, যার আর্থিক মূল্য ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। জিডিপিতে এই আর্থিক মূল্য যোগ হলে নারীদের হিসেব বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ।

অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থা সানেম অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের মূল্যের ‘ছায়া হিসাব’ -এ জানিয়েছে- এ কাজে পুরুষের ভাগ জিডিপির ৯ শতাংশ ও নারীর ৩৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ। নারীদের এই অবধানের আর্থিক হিসেব আমাদের সরকারের কাছে নেই। বেসরকারি গবেষণা জিডিপিতে নারীর অবদান প্রায় সমান হওয়ার পরও আমাদের নারীরা সমান সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে? কেন পাচ্ছে না?

আপনি যদি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এর তথ্য দেখেন তাহলে নারী উন্নয়নের কথা ভেবে খুশিতে গদগদে হয়ে যাবেন। ২০১৯ সালে দেশের মোট শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ৩৬.৩ শতাংশ। যা ১৯৯৫-৯৬ সালে ছিল  ১৫.৮ শতাংশ, ২০০২-০৩ সালে ২৬.১ শতাংশ, ২০০৫-০৬ সালে ২৯.২ শতাংশ, ২০১১-১২ সালে ৩৯.১ শতাংশ এবং ২০১৩-১৪ সালে সালে ৩৩.৫ শতাংশ। আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে দেখা যায়- সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১ কোটি ৮৬ লাখ ৪৬ হাজার নারী কৃষি, শিল্প ও সেবাসহ নানা খাতে কাজ করছে। এর মধ্যে মাত্র ৫৯ লাখ ৩ হাজার নারী অর্থের বিনিময়ে কাজ করছে। তাদের মাসিক আয় গড়ে ১২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। এ হিসাবে, বেতন ও মজুরি বাবদ তারা বছরে আয় করেন ৮৬ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। তার মধ্যে গত গত ১০ বছরে শুধুমাত্র কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ১০৮ শতাংশ। তার বিপরীতে পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে। কিন্তু এই হিসেব করলেও নারীরা বহুগুণ পিছিয়ে।

কর্মক্ষেত্রে নারী রয়েছে মাত্র ৩৬ শতাংশ, যেখানে পুরুষের অংশ ৮০ শতাংশ। তবে সময়ে সাথে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে তা তো নিশ্চয়ই আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এই পরিসখ্যান নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে?

ঐতিহাসিকভাবে নারীদের অবস্থানকে পর্যালোচনা করলে নারী মর্যাদাকে আমরা ভালো উপলব্ধি করতে পারবো। মূলত আমাদের নারীদের পিছিয়ে রাখতে যত কৌশল করা দরকার ছিল তা করেছে পুরুষদের তৈরি করা ধর্মগুলো। ১৩৫১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তুঘলক রাজা ফিরোজ শাহ তুঘলক ও তার পরবর্তীতে লোদী রাজ বংশের অধিপতি সিকান্দর আলী লোদী কর্তৃক বাঙালী মুসলিম নারীদের সর্বত্র অবমূল্যায়ণ করে সামাজিক মূল স্রোত থেকে সরিয়ে নেন। তাদের ঘরবন্দী করে রাখতে আইন জারি করেন। বাইরে চলাচলে বোরখা ও ঢাকা গাড়ি ছাড়া মেয়েদের চলাচল নিষিদ্ধ, বাড়িতে জেনানা মহল তৈরি করে নারীদের শুধু ঘরের কাজের জন্য নিয়োজিত করেন। বলা চলে পুরুষের স্বয়ং দাসী বানিয়ে রাখেন তারা। যার কার্যত  প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বাংলাদেশি বাঙালিদের মধ্যে।

তার একমাত্র কারণ বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারি। যদিও সমাজের নেতৃত্ব থেকে নারীদের সরিয়ে দেয়ার ইতিহাস আরও পুরনো। খ্রীঃপূর্ব ১২০০-৯০ এ উত্তর ও পশ্চিম ভারতে আর্যদের প্রবেশ শুরুর পর মাতৃপ্রাধান্য সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেছিল। কিন্তু ক্ষমতায়ণে নারীদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করলেও তারা মূল সমাজ থেকে ছিটকে পড়েননি। তখনও নারীরা স্বাধীনভাবে বাইরে কাজ করার সুযোগ পেতেন। কিন্তু চূড়ান্তভাবে নারীদের সেখান থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন বিভিন্ন মুসলিম শাসকরা।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর আমাদের নারীরা স্বাধীন দেশে নিজেদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবদান রাখতে শুরু করেন। কিন্তু তা সবসময় ছিল হাতে গুনার মতো। দেশ স্বাধীনের আগ থেকে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নারীদের সমান অধিকারের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করে আসছিলেন। ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইতে বঙ্গবন্ধু নারীদের উন্নয়ন ও সুমর্যাদা নিশ্চিত অর্থনৈতিক শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনে নারীদের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়েছেন। দেশ স্বাধীনের পর  ৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারি চাকরিতে ১০ শতাংশ কোটা ঘোষণা করেছিলেন। তার আগে আমাদের সংবিধানে নারীদের সমান অধিকারের নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছিল একই সাথে নারীতে অগ্রসর করতে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের কথাও বলা হয়। যা সংবিধানে ২৭ ও ২৮ নং অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল। কিন্তু মাত্র সাড়ে তিন বছর সময়কালে তা বাস্তবায়নের সুযোগ হয়নি বঙ্গবন্ধুর।

পরবর্তীতে ৮০ দশকের পর নারীদের উন্নয়নে ও নারী স্বাধীনতার প্রয়োজনে বিভিন্ন আইন সুবিধা তৈরি করা হলেও তা কেবল সুবিধার কথা বলেছিল, বাঙালি নারীদের জন্য কোনো সুযোগ তৈরি করেনি একই সাথে নারীকে নিয়ে পুরুষের মধ্যে মর্যাদাপূর্ণ কোনো ভাবনার সৃষ্টি করতে পারেনি। যার ফলে নারীরা প্রকৃতার্থে নিজেদের এগিয়ে নিতে পারেনি। এর মধ্যে নারীদের যা কাজের স্বাধীনতা ছিল তা কেবল ধনিক শ্রেণির ও জীবিকার প্রয়োজনে নিরূপায় নিম্নশ্রেণীর নারীদের। এই শ্রেণী থেকে আমরা কয়েকটি চরিত্রকে বারবার সামনে এনে প্রমাণ করেছি নারীরা অনেক উন্নতি করছে, সাবলম্বী হয়েছেন, সমাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, ইত্যাদি। যেমন এখনও বাংলাদেশের নারী উন্নয়নের প্রসঙ্গে  বলা হয় আমাদের বর্তমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নারী, সংসদের স্পিকার নারী, অনেক এমপি-মন্ত্রী নারী, ইত্যাদি দেখানো হয়। কিন্তু আসলে কি তারা নারীদের প্রতিনিধিত্ব করেন? বা নারী উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় তারা এই জায়গায় পৌঁছেছেন? তার কোনোটাই সত্য নয় তা ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়!

যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই ৭২ সালে সংবিধান রচনার জন্য যে ৩৫ সদস্যের কমিটি করা হয়েছিল তার একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু। এই রাজিয়া বানু যেভাবে জাতীয়ভাবে উঠে এসেছিলেন তার সুযোগ আমাদের অন্য নারীদের ক্ষেত্রে সমান ছিল? সমান থাকলে ৩৫ জনের কমিটিতে ৩৪ জন পুরুষ থাকার কথা ছিল না।

নারীদের কল্যাণে রাষ্ট্রীয়ভাবে যত সুবিধার কথা বলা হোক না কেন তা কার্যকর হবে না। কারণ যেই সমাজ হাজার বছর ধরে ধর্মকে প্রধান্য দিয়ে চলছে সেই সমাজে নারীর প্রতি পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি কি সেটা আগে জানতে হবে। বাংলাদেশের সমাজে নারীরা পিছিয়ে থাকার কারণ ধর্ম ও সমাজব্যবস্থা আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে যে, নারী মাত্রই দুর্বল, শোষণযোগ্য, পুরুষের চেয়ে নীচু শ্রেণীর। ধর্মের ভয় দেখিয়ে এই সবক আবার নারীদের মাথায় স্থায়ীভাবে গেঁথে দিয়েছে পুরুষরা। এখন পুরুষের অধীনে থাকা নারী কিভাবে সে নিয়ম ভাঙবে? পুরুষের নীলনকশার ধর্মীয় সবক ভুলে নারী কিভাবে তার উন্নতি চাইবে? সুতরাং আমাদের আগে নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কাজে হাত দেয়ার কথা ছিল কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তীতে আজ পর্যন্ত সে কাজে কেউ মনোযোগী হয়নি। শুধু রাষ্ট্রীয়ভাবে সুযোগ সুবিধার কথা বলে কিছু নারী চরিত্রকে সামনে রেখে আমাদের পুরো সমাজের চিত্রকে বিচার করা হয়েছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন জরিপে নারীদের উন্নয়ন দেখানো হয়েছে। সূর্যের দিকে মুখ করে থাকলে যেমন পেছনে ছায়া পড়ে তেমনি নারীদের উন্নয়নের আলোর বিপরীতে ছায়ায় ঢাকা পড়ে আছে কোটি নারীর বেদনা কান্না আর হাহাকার।

শত বছর ধরে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষাক্ষেত্র ও পারিবারিকভাবে নারীদের ব্যাপারে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যে বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে তা এখনও কাটেনি। সর্বশেষ জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) প্রকাশিত ‘সামাজিক লিঙ্গরীতি সূচক’ এর প্রতিবেদনে জানা গেছে সমাজের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ নারীবিদ্বেষী। লৈঙ্গিক বৈষম্য দূরে অগ্রগতি হলেও নারীর প্রতি বিদ্বেষ এখনও কাটেনি। দেখা যায় ৯১ শতাংশ পুরুষ এবং ৮৬ শতাংশ নারী রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সহিংসতা বা প্রজনন অধিকারের ক্ষেত্রে অন্তত একজন হলেও নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক আচরণ করেন। গবেষণা বলছে, ৭৫টি দেশের মধ্যে মাত্র ৬টি দেশের মানুষ নারীর প্রতি কোনো বৈষম্য করে না। অস্ট্রেলিয়া, আন্দোরা, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও সুইডেনের ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ লৈঙ্গিক কুসংস্কারমুক্ত। তবে এ চিত্র বিশ্বের উন্নতিকে প্রতিনিধিত্ব করে না। দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, রুয়ান্ডা ও ব্রাজিলের মতো দেশে গবেষণার ৯ বছরের মধ্যে ৯০ শতাংশ মানুষ অন্তত একজন নারীর প্রতি পক্ষপাত করেছেন। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে এই হার অর্ধেক। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থা কোথায় থাকতে পারে চিন্তা করেন!

উন্নত দেশগুলোতে নারীদের ব্যাপারে বিদ্বেষ ও পুরুষের লিঙ্গভিত্তিক প্রতিযোগিতা থাকলেও নারীকে একমাত্র ভোগের বস্তু অন্তত ভাবা হয় না। তাদের নারীরা ঘরের বাইরে সমাজের সব কাজে অংশগ্রহন করতে পারে কিন্তু আমাদের দেশে নারী মানে এখনও যৌন চাহিদা পূরণের সেবক। আমাদের দৃষ্টিতে এখনও পুরুষের যৌনতার ডাকে সাড়া দিতে নারী বাধ্য। আর তা হলে ধর্ষণ নির্যাতন নারীদের প্রাপ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।নারীর প্রতি সহিংসতার পরিসংখ্যানগুলো দেখলেই এই সমাজে নারীর সম্মান ও নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির এক ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়।

মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৬২২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৭০৩ জন। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ২৪৫ জনকে। অপহরণের শিকার হয়েছে ১৪৭ জন।  নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে ২৬৪ জন। ফতোয়ার শিকার হয়েছে ২৪ জন। শুধু বর্তমানের চিত্র নয় ২০০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধর্ষণের পরিসংখ্যান দেখলে আতঙ্কিত হতে হয়।

বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর তথ্যানুসারে এই সময়ে মোট ধর্ষণের শিকার ১৩ হাজার ৬৩৮ জন, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ২ হাজার ৫২৯ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ৬ হাজার ৯২৭।  ধর্ষণ পরবর্তী খুন ১ হাজার ৪৬৭ এবং ধর্ষণ পরবর্তী আত্মহত্যা ১৫৪ জনের।

আমাদের সমাজে এখন নারী মানে শুধুই নারী। পেশা কিংবা যোগ্যতায়ও নারী কোনো মর্যাদা পায়নি। পুরুষের চোখে নারী মানেই একটা ভোগ্য শরীর, নারী মানেই সহজাত বোকা চরিত্র, মূল্যহীন, নারী মানেই অক্ষম, নারী মানেই খারাপ কিছু । সমাজে প্রচলিত এবং বহুল ব্যবহৃত নোংরা গালিগুলো সবই নারীদের নিয়ে। ৯০ ভাগ মুসলমানের এই দেশে ধর্মীয় ওয়াজের আলোচনা নারীকে খাদ্যবস্তুর সঙ্গে তুলনা, আবাদি জমির মতো করেই নারীকে ভাবা এবং ফতোয়া দেয়া। সিনেমা নাটকের নারী চরিত্র আর বিজ্ঞাপন চিত্রে নারীকে হেয় করে ব্যবহার দিয়েও তো বোঝা যায়; এ সমাজ নারীকে কোন দৃষ্টিতে দেখে। আমাদের সমাজে রাস্তায় দাড়িয়ে থাকা একটি মানসিক ভারসাম্যহীন পুরুষও নারীকে চিনতে ভুল করে না। তার কাছে এটা স্পষ্ট যে নারী মানেই ভোগ করার বস্তু, সে তার আচরণ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বুঝাতে চাই এই নারীর চেয়ে সে শ্রেষ্ঠ এই নারীর প্রতি তার কোনো অধিকার আছে। সেই সমাজে নারীর উন্নয়ন কিভাবে কতটুকু সম্ভব? সুতরাং পরিসংখ্যানে নারীকে এগিয়ে দিয়ে এসব সোকল্ড ট্রেন্ড ট্রায়াল করলে চলবে না। নারীদের মূল স্রোতে ফেরানোর জন্য সবার আগে একটি জাতির মগজের সংস্কার করে তাকে মানবিক করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও এক্টিভিস্ট

সংগৃহীত তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, সিপিডি, সানেম, ইউএনডিপি দৈনিক দেশরূপান্তর, উইকিপিডিয়া, বঙ্গবন্ধু গণপরিষদ সংবিধান (জালাল ফিরোজ), আমার দেখা নয়া চীন (শেখ মুজিবুর রহমান)

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status