করোনা সংকট: লকডাউনে লুকোচুরি

বিজ্ঞাপন

রইলো বাকি রাঙ্গামাটি। অর্থাৎ ২ মে কোভিড ১৯ সংক্রমণের ৫৬ তম দিন পর্যন্ত রাঙ্গামাটি ছাড়া প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে পরেছে করোনার সংক্রমণ। ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ১৭৭ জন। সংক্রমিত ৮ হাজার ৭৯০ জন।

অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে মৃতের সংখ্যা ২ লাখ ৪৩ হাজার ছাড়িয়েছে। এক যুক্তরাষ্ট্রে ছাড়িয়েছে ৬৬ হাজার। ইতালিতে ২৮ হাজার, যুক্তরাজ্যে ২৮ হাজার, ফ্রান্স ও স্পেনে ছাড়িয়েছে ২৪ হাজার। আমাদের পাশের দেশ ভারতেও মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে এগারোশো। গতকাল ১ মে তারা আবারও লকডাউন বাড়িয়েছে ১৭ মে পর্যন্ত।

এই অবস্থায় যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমাদের দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন মে মাস আমাদের জন্যে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এরই মধ্যে আমরা দেখছি একদিকে স্থান ও সংখ্যায় বাড়ছে সংক্রমণ অন্যদিকে চলছে লকডাউনে লুকোচুরি!

মানুষ এক জেলা থেকে আরেক জেলায়, এক উপজেলা থেকে আরেক উপজেলায় এমনকি বিভাগ, রাজধানীতেও যাচ্ছে আসছে। গার্মেন্টসে কর্মরতদের কথা আর কী বলবো। যারা প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেন বছরে তাদের নাকি শ্রমিকদের এক মাসের বেতন দেয়ার মুরোদ নেই!

আসলে প্রথম থেকেই একটা ডেমকেয়ার ভাব এবং সমন্বয়হীনতার পরিলক্ষিত হতে দেখা যাচ্ছে। যেমন সরকারি পর্যায়ে তেমন সাধারণ মানুষের মধ্যে।

সরকারের হাই-প্রোফাইল মন্ত্রী পর্যন্ত লাগামছাড়া কথাবার্তা বলা শুরু করলেন। কেউ বললেন, আমরা করোনার চেয়েও শক্তিশালী। কেউ বললেন, করোনা প্রতিরোধে ঢাকা বিমানবন্দরের মতো ব্যবস্থা উন্নত দেশেও নেই। তো আরেকজন বললেন আমরা চীনের মতো হাসপাতাল বানাবো। অন্য আরেকজন বললেন, এটা এমন কোনো মারাত্মক রোগ নয়, সর্দি জ্বরের মতো। তথ্যমন্ত্রী বললেন, বিএনপি করোনা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতংক ছড়াচ্ছে।

দেশে যখন এসব উদ্ভট তামাশা চলছে অন্যদিকে দেশের পর দেশ আক্রান্ত হচ্ছে। দ্রুত বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, বাড়ছে লাশের স্তূপ। তখন আবার আমরা বলছি আমাদের প্রস্তুতি পর্যাপ্ত। ছুটি নিয়ে চলছে গড়িমসি। অবশেষে ২৫ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষিত হলো। সে আরেক সার্কাস। লঞ্চ টার্মিনাল, বাস টার্মিনাল, রেল স্টেশন সব জায়গায় ভিড় আর ভিড়। বাড়ি ফেরার জন্যে লোকে লোকারণ্য। এর আগেই ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিলো। তাও লোকজন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরাঘুরিতে বেড়িয়ে পড়েন।

অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন ডজন ডজন লোক নিয়ে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে প্রেস ব্রিফিং করবেন, জানাজায় যখন হাজার হাজার লোকের সমাগম হবে, ঢাকা থেকে ট্রেন আসলো সেই ট্রেন আবার সিলেট পৌঁছালো। সংশ্লিষ্টরা বললেন তারা কিছু জানেন না!

ত্রাণ-সাহায্য দিবেন গাদাগাদি করে। লাখ লাখ শ্রমিকদের যখন জমায়েত হতে বাধ্য করবেন। শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে বলা হলো ১০ এপ্রিলের মধ্যে মার্চের বেতন দিতে হবে না হলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাহলে বহু শ্রমিক কেনো বকেয়া বেতনের জন্যে আন্দোলন করতে বাধ্য হলো? অন্যদিকে এই সাধারণ ছুটির সময় ২৫ হাজারের ওপর শ্রমিক ছাঁটাই হলো কেনো? যেখানে সরকার বলছে ঈদের আগে কারো বেতন না দেয়া এবং ছাঁটাই করা যাবে না। যদিও এখানে প্রশ্ন থেকে যায়, তাহলে কী ঈদের পরে ছাঁটাই করলে সমস্যা নেই? এছাড়া ঢাকার বাইরের শ্রমিক আসার প্রয়োজন নেই বলা হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে তাদের বেতন ৪০ ভাগ কাটা হচ্ছে। এসব অব্যবস্থাপনার দায়ভার কার?

আবার দিন আনে দিন খায় মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করা না গেলে তারা ঘরে বসে থাকবেন তা ভাবার কোনো কারণ নেই। তখন হুজুগে লোকজনের সমাগম ঠেকাবেন কীভাবে?

অন্যদিকে আমাদের স্বাস্থ্যসেবার অবস্থা যে কতো শোচনীয় তা পরিষ্কার করে চোখের সামনে তুলে ধরলো করোনা কাল। দেখলাম সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের ঠেলাঠেলি। যারা বছরের পর বছর বেতন, প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সাথে সাথে ক্লিনিক পার্সেন্টেজ, ডায়াগনস্টিক পার্সেন্টেজ, কোম্পানি পার্সেন্টেজ নিলেন তারা কীভাবে অসহায় হয়ে পরলেন।

বিশেষ করে যারা বিভিন্ন স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নেতৃবৃন্দ ছিলেন তাদের তো কোনো প্রস্তুতি ছিলো বলে মনেই হয়নি। একেবারে যখন মাথার উপর এসে পড়লো তখন তারা নেই নেই চিৎকার শুরু করলেন। তাদের কী প্রস্তুতির কোনো ব্যাপার ছিলো না যে, এই মহামারীতে আমাদের কী করণীয়, আমাদের কী আছে, কী নেই এসব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে ব্যবস্থা করা নাকি তারা এসবের মর্মই উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন! যদিও অনেক চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা চেষ্টা করেছেন সাধ্যমতো তারপরও সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ার আর্তি, অভিযোগের অভাব নেই।

আবার মানুষের সুরক্ষার কাজ করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়ে অমানবিক পরিস্থিতিতে পরেছেন অনেকে এটাও সত্য। ভাড়া বাসা থেকে বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। আক্রান্তদের বাড়িতে গিয়ে হুমকি ধমকিও দেয়া হয়েছে। বাইরের জেলায় কর্মরতদের বাড়ি আসতে পরিবারের লোকজনকে নিষেধ করেছে আশপাশের লোকজন।

মূলত সব জায়গায়ই গোঁজামিল ছিলো। সঠিক নির্দেশনার যথেষ্ট ঘাটতি ছিলো। উপযুক্ত একশনের অভাব ছিলো। লক ডাউনের প্রথম দিকে যা কিছু মানামানি চলছিলো আস্তে আস্তে তা প্রায় পুরোপুরিই শেষ হতে চলেছে। কিন্তু কেনো?

আমি এখানে এসেই ফিরে যাবো আমাদের সেই মৌলিক অধিকারের কাছে। রাষ্ট্র কী চায়? বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যবস্থার কাছে। আমাদের চিকিৎসক তৈরি হচ্ছেন কিন্তু তারা তাদের পেশার যে মর্যাদা সেটা অনেকেই আগের মতো উপলব্ধি করছেন বলে মনে হয় না। তাদের কাছে মানুষের চেয়ে মুনাফা মুখ্য হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এটা শুধু এই করোনা কালের প্রেক্ষিতে বলছি না। তাহলে মুনাফার চেয়ে মানুষ গুরুত্ব পাবে কীভাবে? সেখানেই চলে আসছে শিক্ষার প্রসঙ্গ। আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা কী বানাতে চায়- মানুষ না মেশিন? যদি মানুষ বানানোর পণ করে তাহলে একধরনের মানুষ পাওয়া যাবে আর যদি মেশিন বানাতে চায় তবে আরেক ধরণের মানুষ পাওয়া যাবে। তার উপর নির্ভর করছে আগামী দিনগুলো কেমন হবে।

তবে মানুষ হলে এটা নিশ্চিত তখন লকডাউনে আর লুকোচুরি করতে হবে না। সেই মানুষের প্রত্যাশাই থাকলাম। যারা একেবারে নিচতলা থেকে উপরতলা পর্যন্ত মানুষকে অধিকারের প্রশ্নে সমান সুযোগ প্রদান করবেন।

লেখক: শিক্ষক,কবি ও যুবনেতা-বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন। 

সংবাদ২৪-এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব।
প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে 
এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় 
কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়।
  • সংবাদ২৪-এর ‘খোলামত’ বিভাগে আপনিও লেখা পাঠাতে পারেন। লেখার গুণগত মান ও আমাদের সম্পাদকীয় নীতির আলোকে পর্যালোচনা করে আমরা তা প্রকাশ করবো। লেখা পাঠান [email protected] এই ঠিকানায়।

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status