প্রথম পিরিয়ডের অভিজ্ঞতা ও পরিবারের ভূমিকা

বিজ্ঞাপন

সন্তান জন্মদানে সক্ষম প্রতিটি নারীর জীবনের অবধারিত একটি ঘটনার নাম পিরিয়ড। এই একটি জীবন প্রক্রিয়া ছাড়া আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে মানব জাতির বিস্তার ঘটা হয়তো সম্ভবই হতো না।

অথচ এখনও, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই স্বর্ণযুগে এসেও এই স্বাভাবিক ও সার্বজনীন পিরিয়ড  নিয়ে আমাদের দেশসহ পৃথিবীর নানা জায়গায় চলে আসছে অসংখ্য অহেতুক গোপনীয়তা, কুসংস্কার, ট্যাবু।

নারীর পরিবারের সদস্যরা যদি তার পিরিয়ড সম্পর্কে যথাযথভাবে জানেন এবং নিজেদের দায়িত্বটুকু ঠিকভাবে পালন করেন তাহলে অহেতুক গোপনীয়তা, কুসংস্কার ও ট্যাবু আর থাকবেনা। কিন্তু পিরিয়ডের সময় পরিবারের ভূমিকা আসলে কেমন থাকে? কেমন হয় মেয়েদের প্রথম পিরিয়ডের অভিজ্ঞতা? সামাজিক প্রশ্নোত্তর মাধ্যম কোরা’য় আমরা এমন প্রশ্ন করেছিলাম। সেখানে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন অনেক নারী। আসুন জেনে নেই কেমন ছিল তাদের অভিজ্ঞতা।

  • সাবরিনা নাজনীন নামের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলেন-

প্রথম পিরিয়ডের অভিজ্ঞতাটা আমার জন্য খুব দুঃখজনক ছিলো । আসলে আমার মা এ ব্যাপারে তেমন সচেতন ছিলো না । প্রথম পিরিয়ডে আমার “মা”-আমাকে এমন কিছু কথা বলেছিল আর এমন একটা আচরণ করেছিলো যা দেখে আমি খুব হতাশ হয়ে পড়ি ।

কান্নাও করেছিলাম খুব ঐদিনটা । স্যানেটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতাম না তখন । প্রথম দিনেই নোংরা কাপড় ব্যবহার করতে দিয়া হয়েছিল । এভাবে প্রায় দু বছর যায় ।

এরপর আমার মামাতো বোন আমার সাথে এ ব্যাপারে অনেক ভালো ভালো কথা বলে । আর আমার ” মা”-কেও এ ব্যাপারে সচেতনতামূলক কথা বলেন । তারপর আমার এই ব্যাপারে ভুল ভাঙে। অভিজ্ঞতাটা ভালো ছিলো না ।

  • আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা নিয়ে স্নাতক অধ্যয়নরত শ্রেয়সী ভট্টাচার্য লিখেন-

প্রথম পিরিয়ডের অভিজ্ঞতা আহামরি কিছুই ছিল না। স্বাভাবিক ছিল। সাধারণত এই পিরিয়ডের কথা বেশিরভাগ মেয়েরা আগে থেকে জানে না। ফলে তাদের ওটা প্রথমবার হলে পরে তারা ভাবে তাদের অসুখ করেছে, তারা মারা যাবে, ইত্যাদি। তবে আমায় আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, মা বলেনি, বলেছিল ছোটমাসি। আমার সেই প্রথমবার হয় যখন তখন আমার বয়স সাড়ে দশ বছর, ক্লাস ফাইভে পড়তাম।

সেদিন স্কুল বন্ধ ছিল (ভাগ্য ভালো!)। দুপুরবেলা যখন বুঝলাম আমার ‘সেইটা’ হয়ে গেছে, তখন মোটেও ঘাবড়ে যাইনি, তবে মাকে কীভাবে জানাবো তার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মা বারান্দায় বসে এক ভদ্রলোকের সাথে কথা বলছিল। আমি আবার এটা জানি যে এসব বাইরের লোকের সামনে বলে না। আমি গিয়ে শুধু মাকে বলছি, “মা এদিকে একটু শুনে যাও”। মা কড়া চোখে চেয়ে বলছে, ” কী বলবে এইখানেই বলো”।

অনেকবার বলার পর মা ভেতরে এলো, আমি এক শ্বাসে বলে ফেললাম, “ছোটমাসি যেটা বলেছিল সেটা হয়ে গেছে”।

ঘরে একটা বিদ্যুৎ খেলে যাওয়া পরিস্থিতি হল। তারপর সামলে নিয়ে মা যা করনীয় তাই করলেন। বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন কষ্ট হচ্ছে কিনা। আমার ভাগ্য ভালো ছিল, তেমন কষ্ট পেতে হয়নি তখন। অনেক মেয়েরা এটা হলে ভয় পায়, কান্নাকাটি করে, আমি এসব করিনি (হয়তো আগে থেকে জানতাম বলে) বরং মনে বেশ একটা খুশি খুশি ভাব। নতুন একটা ব্যাপার ঘটেছে! কিন্তু সবার মনে এই প্রশ্ন- একটু আগে আগেই বোধয় হয়ে গেল?

পরেরদিন সকালে উঠে আস্তে আস্তে তফাৎ বুঝতে পারলাম। স্নানের সময়ে মা বললেন আজ থেকে এরকম বিশেষ বিশেষ দিনে নিজের কাপড় নিজেই ধুয়ে দিতে হবে। আমি কাপড় ধুয়ে মেলে দিতে যাচ্ছি ওমনি খেয়াল করলাম মা আমার ছোঁয়া এড়িয়ে যাচ্ছেন কারণ তিনি ঠাকুর ঘরে ঢুকবেন। নিজেকে অচ্ছুৎ মনে হল। স্কুলে গেলাম, গিয়ে সবার সাথে আমিও দৌড়ে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছি। বাইরে থেকে কোনভাবে মা দেখেছিলেন সেটা। ফেরার পর বুঝিয়ে বললেন যে দৌড়লে ক্ষতি হতে পারে। আবার তাও বললেন, “সেও কী আর করবে, বয়সটা তো খেলবার বয়স যে!”

পিরিয়ড হলে এক সময়ে মেয়েদের মাটিতে শুতে দিত, সব কাপড়, বিছানার চাদর ধুতে হত, তাদের অনেক কিছু ছুঁতে নেই- যেন কষ্টের মধ্যে আরও কষ্ট দেওয়া। এবং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় মেয়েরাই এসব দিকে বেশি মানাচেনা করেন। মা বলেছিলেন যে বাবাকে খবরটা দেওয়ার পর বাবা নাকি কেঁদে ফেলেছিল। বলেছিল, “বড় তাড়াতাড়ি মেয়েটা বড় হয়ে গেল। এবারে প্রতি মাসই যন্ত্রণা।” শুনে মনে হয়েছিল কোন কোন সময়ে এই ব্যাপারে মেয়েদের থেকে ছেলেরা অনেক বেশি সমঝদার হয়।

  • বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ রাইফেল’স কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রী সুমাইয়া শ্রাবন্তী বলেন-

খুবই হাস্যকর হলেও সত্য আমার পিরিয়ডের অভিজ্ঞতায় কোনো টুইস্ট ছিলো নাহ।আমি তখন ক্লাস সেভেনের ফাইনাল এক্সাম দিবো।নভেম্বরের শুরুর দিক।আমার আশে পাশের সব বন্ধুদের পিরিয়ডের কথা একজন আরেকজন কে বলতো।আমি শুধু হা করে তাকিয়ে থাকতাম।এছাড়া উপায়ও ছিলো না তেমন। তো একদিন আমার অনেক ভালো এক বন্ধু বলল স্কুলে এসে ওর নাকি পিরিয়ড হয়েছে। জানি না আমার সহপাঠীরা একটু অদ্ভুত কিনা। ওরা একেকজন এসে ওকে অভিনন্দন জানাচ্ছিল।

তো এভাবে আরও কয়েকদিন যাওয়ার পর বিকালের দিকে আমি দেখতে পাই আমার ব্লিডিং হচ্ছে।আমি আগে থেকেই এই ব্যাপারে জানতাম। আমি সোজা গিয়ে মম কে বললাম,মম,আমার কি জানি একটা হইসে। উল্লেখ্য আমি কেন জানি লজ্জা পাচ্ছিলাম বলতে।মম কিছু না বলেই আমাকে একটা প্যাড হাতে ধরায় দিলো।আমি জানি না কিভাবে পড়তে হবে,তো আমি ওয়াশরুমে যাওয়ার পর,বুঝতে পারলাম।আর যেভাবেই হোক প্যাড পড়ে বাইরে আসলাম।তো আমার মা তখন একটা উৎসবের মত ব্যাপার শুরু করলো। খালা,নানু,ফুপি সবাইকে কল করে বলছে আমার পিরিয়ডের কথা।আমার কাছে এত লজ্জা লাগছিলো! বাট একটা ব্যাপার ভাবতে মজা লাগছিলো,স্কুলে সবাই এসে আমাকেও অভিনন্দন জানাবে।

মমকে জানি কে বলেছে হলুদ,সোনা আর রুপার পানি মিশিয়ে গোসল করলে পিরিয়ডের সময় কোনো সমস্যা হয় না।তো আমি গোসল করলাম।এই প্রথম আমার ভয় ভয় লাগা শুরু হলো।আমার মা একটু বেশি পরিষ্কার স্বভাবের হওয়ায় আমি বিছানায় বসতেও ইতস্তত বোধ করছিলাম।আমাকে কিছু বলার আগেই আমি নিজে নিজে নিচে বিছানা করে অন্যরুমে শুয়ে পড়তে গেলাম।মম তখন বলল,”এত ঢং করতেসিস কেন?এদিকে আয়।”তখন মমের সাথে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম।এরপর আমি অনেক মাস যাবত মনে মনে চাইতাম,আমার যাতে আর কখনো পিরিয়ড না হয়।নামাজ পড়ে অনেক দোয়াও করতাম আগে পিরিয়ড না হওয়ার জন্য!কেন জানি একটা ঝামেলা মনে হতো এটা।এরপর কমপক্ষে এক বছরের মত আমি মমের কাছে প্যাডের কথা বলতে লজ্জা পেতাম।আস্তে আস্তে ব্যাপার টা আমার কাছে স্বাভাবিক হয়েছে।তবে পিরিয়ডের সময় পেট ব্যথার কথা ভাবলে এখনও শিউরে উঠতে হয়।

  • একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত অনামিকা রায় বলেন-

কোরাতে আজকাল এইসব প্রশ্ন ও করা হয় ।। ভালো লাগল আমার থেকে ছোট অনেকেই খুবই অনায়াসে উত্তর দিয়েছে । Salute তোমাদের

আমার যখন পিরিয়ড হয়েছিল তখন আমি ক্লাস সেভেন এ উঠব মানে সিক্সের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ । তো সারাদিন আমাকে বাসায় বসেই সময় কাটাতে হত। পিরিয়ডের ব্যাপারে আমার তেমন কোন ধারনাই ছিল না। স্কুলের বান্ধবীদের কাছে শুনতাম যে ওদের হয়েছে এর জন্যই সকাল বেলা স্নান করতে হয়। আর এদিকে আমাদের ছিল প্রভাতী শাখা। তাই কোন মেয়েকে যদি দেখতাম চুল ভেজা তাহলে বুজতাম ওর পিরিয়ড হয়েছে । একদিন তো আমি আমার বান্ধবীকে বলে ফেলেছিলাম সবার সামনে । সবার সামনে বলতে ক্লাসের মেয়েদের সামনে । ওই যে খেপাটা খেপেছিল ওইদিন।

আমার কি দোষ ?? আমি বুজতাম না তখন। পরে একদিন ঠাম্মামকে বললাম । ঠাম্মা ও শুধু হাসলো। বলে যে হলেই বুজবি । কিন্তু খবরদার এই কথা কিন্তু আবার কোন ছেলেকে বলিস না

তারপর আমিও আর কিছুই বলিনি । একদিন সকালে ছাদে গিয়ে দড়ি লাফাচ্ছিলাম । সেইদিনই দুপুরবেলা দেখি আমার ফ্রকে রক্ত দিয়ে ভেজা । আমি বোকার মত আশেপাশে তাকিয়ে দেখছি যে কোথাও থেকে আবার এইসব বেরুল।

সাথে সাথে মার কাছে গিয়ে ভয়ে ভয়ে বললাম। মা দেখি কোন বকাই দিল না । উল্টো আদর করে হাতে কাপড় গুজে দিল। পরে আমার ঠাম্মাম কে বলল। সে ও দেখি অনেক খুশি। এদিকে আমি টেনশনে বাঁচি না । হায় হায়!! এখন আমাকেও সকালবেলা স্নান করতে হবে। ওইসব নিয়ে আবার স্কুলে যেতে হবে। পরে আমার বান্ধবীদের বললাম তারাও আমকে অভিনন্দন জানালো। আর ওই যে ফ্রেন্ডটা ছিল ওই আমাকে শুধু বলছিল এইবার দেখ কেমন লাগে। এই ছিল আমার অভিজ্ঞতা । খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার ।

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status