করোনা যুদ্ধে কিভাবে জিতবে বাংলাদেশ?

বিজ্ঞাপন

দেশে দেশে যুদ্ধ সংঘটিত হলে ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধা হয়ে থাকেন দেশের সামরিক-বেসামরিক বাহিনী। অর্থাৎ দেশের আর্মি, পুলিশ, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীর সদস্যগণ যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধটি কোন দেশের সাথে নই, এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে, যার মাথা মুণ্ডু কিছুই নেই, খালি চোখে দেখা যায় না।

সামরিক শক্তিতে বিশ্বের বাঘা বাঘা দেশ আজ এক ভাইরাসে কুপোকাত। তাদের এতো এতো শক্তিশালী সামরিক অস্ত্র কিছুই কাজে আসছে না। আসবে কী করে, ওই অস্ত্র তো মানুষ রক্ষার জন্য তৈরি না, মানুষ মারার জন্য।

কথা হলো, এই ভাইরাস মোকাবিলায় ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধা কারা? অবশ্যই ডাক্তাররা। বড় বড় মাওলানা, পুরহিত, সাধু, দরবেশরা আমাদের গো-মূত্র খাওয়ানো, আর আজগুবি 1.Q7+6=13 টাইপের সূত্র ছাড়া যে আর কিছু দিতে পারবে না তা দেশের অন্তত সচেতন মানুষেরা বুঝে গিয়েছে।

থাক ওসব কথা। যেকোনো দেশের জন্য এখন সবথেকে বড় সম্পদ হলো ডাক্তার এবং বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীরা কোভিড-১৯ এর বিভিন্ন গতিবিধি,কোড,তার আচরণ নিয়ে গবেষণা করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করবেন এবং ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করবেন।

অপরদিকে, ডাক্তাররা যেমন আমাদের অনেক বড় সম্পদ তেমনি তাদের সুরক্ষাটাও দিতে হবে ঐরকম করেই। তাদের হাতেই এখন দেশ। যেমনটা ছিলো ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। কী হতো যদি মহান মুক্তিযুদ্ধে যোদ্ধাদের উন্নত অস্ত্র না দিয়ে লাঠি,বাঁশ আর গামছা,লুঙ্গী পড়িয়ে যুদ্ধে পাঠিয়ে দিতাম? যুদ্ধাদের অস্তিত্ব তো খুঁজে পেতামই না উল্টো সবাই মরে সাফ হয়ে যেতাম। ঠিক তেমনটিই ঘটবে বাংলাদেশে যদি আমরা ডাক্তারদের সুরক্ষা ঠিক মতো দিতে না পারি। তারাই আমাদের এই যুগের মুক্তি যোদ্ধা।

আজ পর্যন্ত ১৭০ জনের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হবার খবর পাওয়া গিয়েছে। ডা. মইন উদ্দীন তো মারাই গেলেন। সেখানে ছিলো পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ।

ধরুন, সারাদেশে ডাক্তার আছেন ১০ জন আর রোগী আছে ১ হাজার। মানে,প্রতি একজন ডাক্তারের জন্য ১০০ জন রোগী, এখান থেকে যদি ৫ জন ডাক্তার অসুস্থ হয়ে যান তখন বাকি ৫ জনের মধ্যে একজনের উপর পড়বে ২০০ জন করে রোগী। তখন আর রোগীর সেবা করতে হবে না জাস্ট একবার গুনলেই দিন শেষ হয়ে যাবে ডাক্তারদের। চিন্তা করুন ডাক্তার সংকটে পড়লে কী ভয়াবহ বিপদ ঘটতে পারে! মানে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু!

এখনো বিভিন্ন হসপিটাল থেকে অভিযোগ আসছে পর্যাপ্ত পিপিই(পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট) নেই, কীট নেই, খাবার নেই। শুধু নেই নেই। এইভাবে অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধাদের যুদ্ধে পাঠিয়ে দেয়া কতোটা বিপজ্জনক সেটা আজ না বুঝলেও পরে বুঝবো। ডাক্তাররা ভিন্ন গ্রহের ভিন্ন বস্তুর তৈরি এলিয়েন না যে তারা করোনায় আক্রান্ত হবেন না। আপনার মতো তাদেরও পরিবার পরিজন আছে। তারাও আমাদের মতোই মানুষ, তাদেরও করোনার ভয় আছে, জীবনের মায়া আছে।

তাদের সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়, আমাদেরও। কিন্তু সেই আমরাই এই যুদ্ধাদের সবথেকে বড় ক্ষতিটা করছি। হসপিটালে গিয়ে মিথ্যা বলছি। ডাক্তাররাও এসব দেশদ্রোহীদের কথা বিশ্বাস করে চিকিৎসা দিচ্ছে। পরে জানা যায় রোগী আসলে করোনা আক্রান্ত এবং সেই সাথে ডাক্তার, নার্স এবং পুরো হসপিটালকে কোয়ারান্টিনে পাঠাচ্ছে। এই এক মহামূর্খের জন্য একটা যুদ্ধঘাটি (হসপিটাল) তো হারালামই সাথে অন্য সাধারণ রোগীর চিকিৎসার দরজাও বন্ধ হয়ে গেলো।

একজন ডাক্তার আক্রান্ত হওয়া মানে আরেকজন ডাক্তারের চিকিৎসা দেয়াতে ভয় চলে আসা, চিকিৎসা ভার বেড়ে যাওয়া। এটা কোনভাবেই কাম্য নয়। এইভাবে একে একে যোদ্ধা আহত-নিহত হয়ে যাওয়া নিশ্চিতভাবে যুদ্ধে হেরে যাওয়া। ত্রাণ সহায়তা, জনসচেতনতা, এবং অন্যান্য যতো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে ভাইরাস মোকাবিলার জন্য তার মধ্যে সব থেকে বেশি গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে চিকিৎসকদের।

আর যারা মিথ্যা বলে ডাক্তারদের সংক্রমিত করছেন, পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা দিচ্ছেন না, N-95 মাস্কের বদলে নকল মাস্ক দিয়ে যুদ্ধে পাঠাচ্ছেন তারা আমার চোখে দেশদ্রোহী। ওরাই সবচেয়ে বড় রাজাকার। যুদ্ধাপরাধীদের আমরা যেভাবে ঘৃণা করি তাদেরও এ জাতি ঘৃণা করবে নিশ্চয়।

যেকোনো মূল্যে ডাক্তারদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা ব্যবস্থা করে দিতে হবে, স্বাস্থ্যখাতকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। নয়তো, রাস্তাঘাটে লাশের পর লাশ পড়ে থাকবে দেখার কেউ থাকবে না। কুকুর, বিড়াল, শকুন টেনে ছিঁড়ে খাবে কবর দেয়ার কেউ থাকবে না। সবাই মৃত্যুর মিছিলের সামিল হয়ে যাবো ততদিনে।

আমাদের মতো গরীব, অশিক্ষিত, অসচেতন, বিপুল জনসংখ্যা, স্বাস্থ্যখাতের বেহাল দশা, ধর্মান্ধে গিজগিজ করা দেশে যেকোনো ভয়াবহ ঘটনা ঘটে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেনের মতো দেশ যেখানে হাজারে হাজারে মানুষ মরছে সেখানে আমার দেশের কথা কল্পনা করতেও হাত পা কেঁপে উঠে।

ইতোমধ্যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হয়ে যাওয়া বিশাল গণ-জমায়েত চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের ভবিষ্যৎ। আপনিই পারেন সতর্ক থেকে করোনা মুক্ত থাকতে, করোনা সংক্রমণ হলেও ডাক্তারের কাছে ভয় পেয়ে মিথ্যা বলে তাদের সংক্রমিত না করতে, ডাক্তার দের সর্বোচ্চ সুরক্ষা দিয়ে দেশটাকে ভালো রাখতে। অর্থাৎ আপনার হাতেই পুরো বাংলাদেশের সুরক্ষা,আপনিই পারেন ১৮ কোটি মানুষকে ভালো রাখতে। সুতরাং বাংলাদেশকে ভালো রাখুন।

সংবাদ২৪-এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব।
প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে 
এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় 
কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়।

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status