করোনা মোকাবিলায় আমাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা

বিজ্ঞাপন

সমগ্র বিশ্ব লিপ্ত হয়েছে ক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে। অনেকটাই ঢাল – তলোয়ার বিহীন যুদ্ধ। এক অদৃশ্য বস্তুর আতংক গ্রাস করে রেখেছে মানব সভ্যতাকে। পৃথিবী ক্ষণেই পরিণত হতে পারে মৃত্যুপুরীতে।

প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হচ্ছে হাজার হাজার লোক। দ্রুত হারে দেশ থেকে দেশান্তরে,এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে কোভিড-১৯।  প্রতিনিয়ত রূপ পরিবর্তন করে নতুন রূপে উপস্থাপন করছে নিজেকে। কিন্তু এ রূপ যে প্রচণ্ড ভয়ানক। কিভাবে পরাস্ত করা যাবে এ অদৃশ্য শক্তিকে?সমাধান কোন পথে?

ইতিহাসের পাতায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই চোখের তারায় ভেসে উঠে বিশ্বযুদ্ধের বিবর্ণ চিত্র।দেখতে পাই অস্ত্রের ঝনঝনানি – পারমাণবিক বোমার হুংকার – সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ।আর এই ২ টি বিশ্ব যুদ্ধের দামামায় মানবসভ্যতা ভুলতে বসেছে প্লেগ – কলেরা – স্প্যানিশ ফ্লুর তান্তব। বিশ্ব জুড়ে সামরিক খাতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় তার তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় নগণ্যই বলা যায়।আর করোনা এসে আবারো প্রমাণ করে দিলো, রাষ্ট্রের ব্যয় কোন দিকে সর্বোচ্চ হওয়া উচিত।

করোনা কেবল মাত্র অপূরণীয় ক্ষতি করে ফেলছে না পাশাপাশি মীমাংসা করছে অনেক গুলো প্রশ্নের।চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের কেমন আচরণ হওয়া উচিৎ এবং মানুষের প্রতি মানুষের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিৎ। লোহায় মরিচা না ধরার জন্য যেমন জিংকের প্রলেপ দেওয়া হয় তেমনি অন্তঃসার শূন্য পুঁজিবাদের নগ্ন রূপকে আড়াল করার জন্য যুদ্ধের ডামাডোল পিটানো হয়, ছড়ানো হয় সাম্প্রদায়িক বিষ-বাষ্প।

আর আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় মদদে সাম্প্রদায়িক তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজানো হয় উন্নয়নের রোল মডেলের বাঁশি।আজ সে বাঁশি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে করোনাভাইরাস। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের যুক্তিহীন বক্তব্য যেমন সেটা প্রমাণ করে তেমনি প্রমাণ করে, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকা,স্বাস্থ্য কর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা, খাদ্যের জন্য আত্মহত্যা ও মৌলবাদের প্রতিক্রিয়াশীল তৎপরতা ইত্যাদি।

করোনা দুর্যোগে ব্যহত হয়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সবাইকে ঘরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছে সরকার।অথচ এই লকডাউনের মধ্যেই খুলে দেওয়া হলো গার্মেন্টস শিল্প। এ কেমন ঘরে থাকার পরামর্শ?? একদিকে গণপরিবহন বন্ধ অন্যদিকে কাজ হারানোর ভয়,অন্যদিকে করোনা।শ্রমিকরা সম্পূর্ণ দিশেহারা। আর এ দিশেহারা অবস্থার মধ্যে ঘি ঢালছে সামাজিক দূরত্ব বাক্যটি।অথচ সামাজিক দূরত্ব বৃদ্ধি পেলে বাড়বে একাকীত্ব হতাশা, হ্রাস পাবে মানুষের প্রতি মানুষের নৈর্ব্যক্তিক ভালোবাসা। তাই এখানে দৈহিক দূরত্ব কথাটি অধিক যৌক্তিক।

গার্মেন্টস খুলে দেওয়ায় পায়ে হেটে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শ্রমিকরা ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করলো।ঢাকায় গিয়ে পড়তে হলো আরও বড় সমস্যায়,লকডাউনে বাসা মালিকরা ঢুকতে না দেওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিককে রাত কাটাতে হয়েছে রাস্তায়।এখানেই কি বঞ্চনার শেষ?  পরে জানানো হল গার্মেন্টস বন্ধ। কতটা অমানবিক আচরণ!

অপরদিকে, করোনা দুর্যোগে সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলো। কি পেলাম সেখানে? শিল্প মালিকদের জন্য ২ শতাংশ সুদে ঋণ আর কৃষকের জন্য ৫ শতাংশ সুদে ঋণ। করোনা দুর্যোগেও প্রমাণ হলো, রাষ্ট্র শ্রমিক কিংবা কৃষি নয় বরং মালিক বান্ধব। করোনা এসে কার্ল মার্কস – ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের কথাটিকেই জীবন্ত করে তুলল “পুঁজি হলো স্বাধীন এবং তার রয়েছে স্বতন্ত্র স্বত্বা, আর জীবন্ত মানুষ হলো পরাধীন এবং তার নেই কোন জীবন্ত স্বত্বা “।

আজ থেকে প্রায় তিন মাস আগে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল,করোনা মোকাবেলায় আমাদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। কিন্তু ক্রমেই বাস্তব সত্য জনসমক্ষে ফুটে উঠলো।পর্যাপ্ত পরিমাণ কিট-পিপিই-ভাইরাসরোধী মাস্ক-ভেন্টিলেটর নেই ।বরং মানহীন পিপিই ও মাস্ক নিয়ে মন্তব্য করায় ১০ জন ডাক্তারকে শোকজ করা হল।চাকরিচ্যুত করা হলো দুইজন স্কুল শিক্ষকে ফেসবুকে করোনা নিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়ায়।অন্যদিকে, গণ স্বাস্থ্যের কিট নিয়ে তর্ক – বিতর্ক। পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি থাকতেই পারে কিন্তু আমাদের সংকটের দিকে তো চোখ তুলে তাকাতে হবে।

সরকার গণস্বাস্থ্যের কিট নিয়ে শুরু থেকেই আন্তরিক ছিল না।এজন্য সরকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গণস্বাস্থ্যের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়নি।এমনকি, কিট হস্তান্তর অনুষ্ঠানেও সরকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কেউ যায় নি।অথচ,কিট হস্তান্তর মানেই অনুমোদন নয়,কার্যকরী না হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বাতিল করে দিতো পারতো। এ যে অনেকটা,”ভাত দেওয়ার মুরদ নেই, কিল দেওয়ার গোসাঁই “। যুক্তি উপস্থাপন করা হচ্ছে,৩০ শতাংশ নেগেটিভ ফলাফল আসবে। কিন্তু অন্তত ৭০ শতাংশতো পজিটিভ ফলাফল আসবে। এই কিটের অনুমোদন দিলে প্রচুর পরীক্ষা করা সম্ভব হতো। সহজলভ্য হওয়ায় সন্দেহভাজন নেগেটিভ রুগীকে দুই বা ততোধিক বার পরীক্ষা করা যেত।

একদিকে,পুঁজিবাদী রাষ্ট্র আমেরিকা, ইতালি, কানাডা সহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র করোনায় বিপর্যস্ত। মৃত্যুর মিছিলে প্রকম্পিত তাদের রাজপথ। হতাশ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী।কিন্তু আকাশের দিকে যে তাকানোর সময় নেই ফিদেলের কিউবার।তাইতো তারা বাড়িয়ে দিয়েছে বন্ধুত্বের হাত, নিজের দেশে করোনাকে দক্ষতার সহিত পরাস্ত করে।করোনা দুর্যোগে এ পর্যন্ত ২২ টি দেশে ১২০০ জন স্বাস্থ্য কর্মীকে পাঠিয়েছে কিউবা। এছাড়াও ৬০ টি দেশে ছড়িয়ে রয়েছে ৩০,০০০ কিউবান ডাক্তার।

কিউবার পাশাপাশি চীন, ভিয়েতনাম, নেপাল, এমনকি ভারতের একটি রাজ্য কেরালা করোনা ভাইরাসকে দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করেছে।সেখানে কোন মানুষকে অভুক্ত থাকতে হয় নি,ক্ষুধার জ্বালায় আত্মহত্যা করতে হয় নি,স্বাস্থ্য কর্মীরা নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে চিকিৎসা প্রদান থেকে সরে দাড়ায় নি।কেবলমাত্র, মাথাপিছু আয় দিয়ে যে রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন বিবেচনা করা যায় না কেরালা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।কারণ,রাষ্ট্রগুলো কমিউনিস্ট শাসিত। সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ও বিপ্লবী মানবতাবাদ।

করোনা যেমন আমাদের সংকট ও দুর্বলতাকে চোখের সামনে হাজির করেছে তেমনি আমাদের শক্তিসামর্থ্যকে অনুধাবন করেছে। আর এই শক্তি সামর্থ্য হচ্ছে তারুণ্য । করোনা যুদ্ধে সরকার সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলেও বসে থাকেনি ছাত্র-যুবক-তরুণেরা।

স্বাস্থ্য সচেতন, হ্যান্ড স্যনিটাইজার, ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ কোন কাজেই পিছিয়ে ছিল না তরুণরা।দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবতাকেই পুষেছিল অন্তরে। চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের জন্য তরুণদেরই আত্মত্যাগ করতে হবে।পূর্বেই বলেছিলাম, “ঢাল-তলোয়ার বিহীন যুদ্ধ”। তাইবলে হতাশ হলে চলবে না।মনে রাখতে হবে, “যুদ্ধের ময়দানে বলের চেয়ে কৌশল অধিক তাৎপর্যপূর্ণ”

  • প্রিতম দাস, লেখক ও ছাত্রনেতা

    সংবাদ২৪-এ প্রকাশিত প্রতিটি লেখার বিষয়বস্তু, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যসমুহ সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব।
    প্রকাশিত সকল লেখার বিষয়বস্তু ও মতামত পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতির সাথে সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে 
    এমন নয়। লেখকের কোনো লেখার বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের যথার্থতার আইনগত বা অন্যকোনো দায় 
    কর্তৃপক্ষ বহন করতে বাধ্য নয়।
    
    • সংবাদ২৪-এর ‘খোলামত’ বিভাগে আপনিও লেখা পাঠাতে পারেন। লেখারগুণগত মান ও আমাদের সম্পাদকীয় নীতির আলোকে পর্যালোচনা করে আমরা তা প্রকাশ করবো। লেখা পাঠান [email protected] এই ঠিকানায়।

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status