এক নামে কতো ধাম!

বিজ্ঞাপন

দেশ-কাল-পাত্র ভেদে স্থানের আলাদা আলাদা নাম হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক কারণে, কখনো কোনো বরেণ্য ব্যক্তির নামে, এমনকি শাসকের নামেও হয় স্থানের নামকরণ। আবার মানুষের মুখে মুখেও কোনো কোনো স্থানের নতুন নাম প্রচলিত হয়ে ওঠে। সরকারি বা রাষ্ট্রীয় আদেশেও কখনও কোনো স্থানের নামকরণ হতে পারে।

সাধারণত ভিন্ন ভিন্ন জনপদের ভিন্ন ভিন্ন নাম থাকলেও একই নামে দূর দূরান্তের ভিন্ন কোনো স্থানের নামকরণ হয়। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ভিন্ন ৬৪টি নাম আছে। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেনই না, কোনো কোনো জেলার নামেই আছে অপর কোনো জেলার কোনো উপজেলা, ইউনিয়ন বা গ্রামের নাম। এমনকি ভিনদেশেও কোনো স্থানের সাথে মিলে যেতে পারে এসব নামের কোনো কোনোটি। আবার কোনো একটি স্থানের নামে হয়তো অপর কোনো দেশের জাতীয় ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে।

ভিন্ন স্থানের একই নামের এ ধরনের বৈচিত্র্যময় কিছু নজির সংকলন করেছেন বাপ্পাদিত্য বসু।

কু‌ষ্টিয়া বাংলাদেশের একটা জেলার নাম। এদিকে যশোরের চৌগাছা উপজেলার এক‌টি গ্রামের নাম কু‌ষ্টিয়া। ময়মনসিংহে বিদ্যাগঞ্জের কাছেও কুষ্টিয়া নামের একটি গ্ৰাম আছে। আবার একই জেলার মুক্তাগাছা উপজেলায়ও আছে আরেক কুষ্টিয়া গ্রাম। আবার কু‌ষ্টিয়া নামেআরেকটিগ্রাম আছে টাঙ্গাইলের কা‌লিহা‌তি উপজেলায়। কা‌লিহা‌তিতে কিন্তু সাভার নামেও গ্রাম আছে। অথচ সাভার ঢাকার এক‌টি উপজেলা।

ফ‌রিদপুর আরেকটি জেলার নাম হলেও পাবনা জেলায় কিন্তু ফরিদপুর নামের একটি উপজেলাও রয়েছে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের এক‌টি গ্রামের নামও কিন্তু ফ‌রিদপুর। আবার যশোর বিমানবন্দরের ঠিকপাশেইরয়েছে আরেক ফ‌রিদপুর গ্রাম। আরো আছে, ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা উপজেলাতেও রয়েছে ফরিদপুর নামের গ্রাম। নেত্রকোনা সদর উপজেলাতেও পাবেন একই নামের আরেকটি গ্রাম।

কিশোরগঞ্জ থেকে নির্বাচিত ৩ রাষ্ট্রপতি

হাওর-বিধৌত জেলা ‌কিশোরগঞ্জ। বাংলাদেশের ইতিহাসের অধিকাংশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন এই জেলা থেকে। ওদিকে উত্তরের জেলা নীলফামারীতে কিশোরগঞ্জ নামে একটা উপজেলা আছে। এই কিশোরগঞ্জেরই একটি উপজেলা হলো ভৈরব। এটি বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ৬৫তম জেলাও বটে। অথচ ভৈরব নামের নদী‌টি কোথায় জানেন? দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্ত জেলা যশোরে।

এদিকে দক্ষিণবঙ্গের বিভাগীয় শহর ও জেলা বরিশাল। কিন্তু উত্তরের জেলা গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপ‌জেলায় পাবেন ব‌রিশাল নামে এক‌টি ইউনিয়ন। এই গাইবান্ধারই গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা সদরে রয়েছে এক মতিঝিল। অথচ রাজধানীর বুকে মতিঝিল এলাকা অর্থ-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে সারাদেশেই পরিচিত। আবার গোবিন্দগঞ্জ কিন্তু কেবল গাইবান্ধার সম্পদ নয়, সিলেটে পাবেন আরেক গোবিন্দগঞ্জ।

বাংলাদেশে এক কালীগঞ্জ নামেই উপ‌জেলা রয়েছে চার‌টি- ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, লালম‌নিরহাট আর গাজীপুর জেলায়। আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবিনগর উপজেলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কালীগঞ্জ নামে একটি বর্ধিষ্ণু গ্রামের সন্ধান আছে। বনলতা সেন আর বিখ্যাত কাঁচাগোল্লার জনপদ নাটোর জেলার চলনবিল অধ্যুষিত উপজেলা সিংড়ার সাত্তারদীঘি ইউনিয়নে কালীগঞ্জ নামে একটি হাট আছে। ওদিকে আবার ব‌রিশা‌লের হিজলা উপজেলায় কালীগঞ্জ না‌মে এক‌টি বাজার ও ইউনিয়নআছে। এই হিজলা নামে আবার একটা গ্রাম পাবেন বা‌গেরহা‌ট জেলার মধ্যে।

রাজা-জ‌মিদারদের ইতিহাস‌ বিজ‌ড়িত বাংলাদেশে রাজবাড়ীর অভাব নেই। কিন্তু জেলা হি‌সেবে পদ্মাপাড়ের রাজবাড়ীই একমাত্র। আগে ফরিদপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত থাকার কারণে একে অনেকেই ফরিদপুর রাজবাড়ী বলে ডাকেন।

এ নিয়ে এক মজার গল্প আছে। প্রখ্যাত নাট্যজন মাসুম আজিজের বাড়ি পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলায়। এই উপজেলা ফরিদপুরে একটি পুরনো রাজবাড়ী আছে। তার এক বন্ধু বেড়াতে যাবেন তাদের গ্রামের বাড়ি। সে আশির দশকের ঘটনা। মাসুম আজিজ তাকে ঠিকানা দিয়েছেন পাবনার ফরিদপুর উপজেলার রাজবাড়ী যেতে হবে। বেচারা বন্ধু গেলেন গাবতলি। বললেন- গন্তব্য ফরিদপুর রাজবাড়ী। বাসের লোকজন টেনে তুললো তাকে রাজবাড়ীর গাড়িতে। দুটোই তো পদ্মা পাড়ি দেবার ব্যাপার। পদ্মা পাড়ি দিয়ে তিনি পৌঁছালেন জেলা রাজবাড়ীতে। তখন তো আর মুঠোফোনের যুগ নয়। ফলে বন্ধুর কাছ থেকে বারবার জেনে নেওয়ার সুযোগও ছিলো না। বেচারার আর যাওয়া হলো না বন্ধুর বাড়ি। মাসুম আজিজ নিজেই মজার এই ঘটনা জানিয়েছেন। ভিন্ন ধামের অভিন্ন নামের বিড়ম্বনা বুঝি একেই বলে!

গজনীর জঙ্গল যাবেন? শেরপুর জেলায়, বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় না কিন্তু। নামের টানে দিক ভুলে যেন মাসুম আজিজ এর বন্ধুর মতো না হয়!

ইলিশের দেশ চাঁদপুরের কচুয়ার মতোই ষাটগম্বুজ মসজিদের জনপদ বাগেরহাটেও রয়েছে আরেক কচুয়া। দুটোই কিন্তু উপজেলা। আবার যশোর জেলার সদ‌র উপজেলার একটি ইউনিয়নের নামও কচুয়া। আবার চাঁদপুরের মতলব উপজেলায় জামালপুর নামে একটি গ্রাম আছে। কিন্তু জামালপুর সেই সুদূরের একটি জেলা বটে।

পীরগঞ্জ নামের উপজেলা আছে উত্তরের দুই প্রতিবেশী জেলা রংপুর এবং ঠাকুরগাঁওয়ে। আবার সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলায় রয়েছে পীরগঞ্জ নামে একটি গ্রাম।‌ শিবগঞ্জ না‌মের উপজেলাও পাবেন দুটো রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও বগুড়া দুই জেলাতেই। আবার সিলেট শহরেও রয়েছে শিবগঞ্জ নামের একটি জায়গা।

ঢাকার শাপলা চত্বরেরমতোই শাপলা চত্বর আছে রংপুর শহরেও। পার্বত্য জেলা শহর খাগড়াছড়িতেও পাবেন আরেক শাপলা চত্বর। সম্প্রতি নরসিংদী জেলা শহরেও শাপলা চত্বর নির্মিত হয়েছে। উত্তরের বিভাগীয় শহর রংপুর আর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা শহর ঝিনাইদহ- দুই শহরেই রয়েছে পায়রা চত্বর।

আর বৌবাজারের তো অভাব নেই। কেবল রাজধানীর বুকেই খুঁজলে বৌবাজার পাবেন দশটির বেশি। রাজধানীর বাইরেও বৌবাজার পাবেন বিভিন্ন শহরে।

ঢাকা নিউ মার্কেট ও কলকাতা নিউ মার্কেট

আর নিউমার্কেট তো রয়েছে বেশকিছু জেলাশহরে। ঢাকা নিউমার্কেটটি ৩৫ একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠে ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সাল জুড়ে। চালু হওয়ার পর থেকে ধরলে এর বয়স এখন ৬৬ বছর। অথচ নাম তার নিউমার্কেট। দেশের পুরনো শহরগুলোতে নিউমার্কেট না যে বিপণীবিতানগুলো আছে, তার কোনোটিই আসলে নতুন নয়। নিউমার্কেট নামেই সুবিশাল বিপণীবিতান পাবেন ওপার বাংলার কলকাতাতেও। এটি তো আরো পুরনো, ১৮৭৪ সালের।

এদিকে ব্রাহ্মণবা‌ড়িয়ার ন‌বিনগর উপজেলাহলেও ঢাকার ন‌বিনগর কিন্তু উপ‌জেলা নয়। জায়গাটি সাভার উপজেলার অন্তর্গত। তবে জাতীয় স্মৃ‌তি‌সৌধের জন্য জগৎখ্যাত। দেশের সর্বস্তরের মানুষ থেকে শুরু করে বহু বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান-সরকার প্রধানের পদধুলি পড়েছে এই নবিনগরে।

ওদিকে আবার ৬৪ জেলার মধ্যে একটি হলো লক্ষ্মীপুর। তবে রাজশাহী শহরের লক্ষ্মীপুর জায়গাটাও কম নামকরা নয়। গাজীপুর জেলা শহরেও রয়েছে লক্ষ্মীপুর নামের একটি জায়গা, শোনা যায় জায়গাটি অবশ্য মাদকসহ অন্যান্য অপরাধের অভয়াশ্রম বলে কুখ্যাত। তবে গাজীপুর জেলারই শ্রীপুর উপজেলায় রয়েছে লক্ষ্মীপুর নামের আরেক গ্রাম, এটি কিন্তু ছায়া-সুনিবিড়-শান্তির নীড়। এখানেই শেষ নয়, সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলা আর সিলেট জেলার দক্ষিণ সুরমা উপজেলাতেও কিন্তু লক্ষ্মীপুর নামে গ্রাম আছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিলেটের একটি ইউনিয়ন, আস‌লে কিন্তু এটি ঢাকার দক্ষিণে নয়। তবে ঢাকা দক্ষিণ কিন্তু রাজধানীর বৃহৎ সিটি করপোরেশন।

চায়ের দেশ মৌলভীবাজার জেলা ও পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক ব্যবসা কেন্দ্র মৌলভীবাজার।

চা বাগানের দেশ মৌলভীবাজার জেলা হলেও ঢাকার বিখ্যাত পাইকারী বাজারটার নামও মৌলভীবাজার। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের সাথে সাথে এই ঢাকাই মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীরাই দেশের পণ্যমূল্যের ওঠা-নামা নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে মৌলভীজারা জেলার একটি উপজেলা রাজনগর কিন্তু একই জেলার আরেক উপজেলা কুলাউড়ায় রাজনগর নামে একটি গ্রাম রয়েছে। এই জেলার রাজনগর ও কমলগঞ্জ উপজেলায় মুন্সবাজার নামে পৃথম বড় দুটি বাজারও রয়েছে। আবার উত্তরবঙ্গের রংপুরেও এ নামে এক‌টি জায়গা আছে। জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার আওনা ইউনিয়নে মৌলভীবাজার নামে একটা বাজারও আছে।

কোম্পানীগঞ্জ নামে উপজেলা আছে সিলেট আর নোয়াখালী দুই জেলাতেই। অথচ এ দুই জনপদের দূরত্ব অন্তত সাড়ে তিনশো কিলোমিটার।‌কয়লাখ‌নি আন্দোলনের জন্যদিনাজপু‌রের ফুলবাড়ী উপজেলা বিখ্যাত হলেও এই উত্তরবঙ্গেরই কু‌ড়িগ্রামে আছে আরেক ফুলবাড়ী উপজেলা। আর সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় পাবেন ফুলবাড়ী নামে একটি ইউনিয়ন। এখানেই শেষ নয়, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার বড় একটি চা বাগানের নাম ফুলবাড়ী।

১৯৭১ সালের ঢাকার বিজয়নগর

রাজধানীর বিজয়নগর তো নামকরা। একদিকে ফ‌কিরাপুল, একদিকে কাকরাইল, একদিকে চলে গেলো পল্টন হ‌য়ে গু‌লিস্তা‌নের রাস্তা। ওদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাতেও কিন্তু বিজয়নগর নামের উপজেলা আছে। ঢাকার ফকিরাপুলের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও ফকিরাপুল নামক জায়গা পাবেন।এদিকে রাজধানীর বুকে মহাখালী থেকে সোজা এয়ারপোর্টের দিকে গেলে আপনি পাবেন বনানী। কে না চেনেন? বগুড়া শহরের উপকণ্ঠেও কিন্তু আরেক বনানী আছে, যেতে চান? সেখানে একটি পর্যটন মোটেলও পাবেন রাত কাটানোর জন্য। একইভাবে মৌলভীবাজার জেলা শহরের একটি অভিজাত এলাকার নামও বনানী, সেখানে রাজধানীর বনশ্রী নামেও একটি আবাসিক এলাকা আছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান। কিন্তু উত্তরের জয়পুরহাট জেলা শহরে গুলশান পাড়া নামে একটি এলাকা আছে। আবার জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার নামেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় একটি গ্রাম আছে।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া। কিন্তু নড়াইলেও আছে লোহাগড়া। এ দুটোই কিন্তু উপজেলা। আবার নড়াইল জেলা হলেও গোপালগ‌ঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় আছে এই না‌মের একটি গ্রাম। আর নড়াইলের পাশের জেলা মাগুরা। কিন্তু দূরের মৌলভীবাজার জেলায় মাগুরা নামেই আছে ইউনিয়ন।

গড়াই পাড়ের কুষ্টিয়া আর পদ্মা পাড়ের মানিকগঞ্জ- দুই জেলাতেই দৌলতপুর নামে উপজেলা আছে।খুলনার দৌলতপুর উপজেলা না হলেও ব্রজলাল কলেজের জন্য রীতিমতো বিখ্যাত। ওদিকে আবার কুষ্টিয়ার রামদিয়া তো রামের মটকার জন্য বিখ্যাত। তবে রামদিয়া নামে আরেক গ্রাম কিন্তু আছে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায়।

নোয়াখালীর বিখ্যাত চৌমুহ‌নীর মতোই চট্টগ্রাম শহরে আছে আরেক চৌমুহনী। তবে চট্টগ্রামের বেতাগী গ্রাম হলেও বরগুনা জেলার বেতাগী কিন্তু উপজেলা।হাজীগঞ্জ চাঁদপুর জেলার একটি উপজেলার নাম। আবার নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলায় হাজীগঞ্জ নামে গ্রামও রয়েছে।বরিশালের কাজীরহাট একটি থানা। আবার ওদিকে শরীয়তপুরের হাট-বন্দরের নাম কাজীরহাট। এই কাজীরহাটে আবার আছে একটি ফেরীঘাটও।

নাটোরের লালপুর উপজেলায় এবং রাজশাহী জেলায় কেশবপুর নামের দুটো গ্রাম থাকলেও যশোরের কেশবপুর কিন্তু উপজেলা। মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি সাগরদাঁড়ি গ্রাম এই কেশবপুর উপজেলাতেই।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি ’মধুপল্লী’

রাজধানী ঢাকার ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডের নাম নিশ্চয়ই জানেন সবাই। গুলিস্তানের পাশেই, নগর ভবনের পিছনে।ময়মনসিংহে কিন্তু ফুলবাড়িয়া উপজেলা আছে।ঢাকার মিরপুর তো চেনেনই। একসময়ের মিরপুর পৌরসভা এখন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একটি বর্ধিষ্ণু অঞ্চল। আবার কুষ্টিয়া জেলায় রয়েছে মিরপুর উপজেলা, হবিগঞ্জেও আছে মিরপুর নামে একটি বড় বাজার। তাহলে ঢাকার মোহাম্মদপুরই বা বাদ যাবে কেন? মাগুরা জেলায় মোহাম্মদপুর নামে একটি উপজেলা পাবেন। এবার কি তবে ঢাকার বাইরে ধানমণ্ডিও খুঁজবেন? খুঁজুন, পাবেন। কুমিল্লা জেলায় ধানমণ্ডি নামে গ্রাম আছে। কুমিল্লায় কিন্তু গাজীপুর নামেও গ্রাম আছে। এদিকে গাজীপুর আবার ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা।

পাবনার পাকশী কোনো উপজেলা শহরও নয়, কিন্তু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালন শাহ সেতু, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রভৃতি বৃহৎ স্থাপনার কারণে দেশবিখ্যাত। ওদিকে আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় একটি ইউনিয়ন আছে পাকশী নামেই।

ইছামতি নদী

এবার তবে ইছামতীর গল্পে আসুন। এই এক নামে এদেশে কয়টা নদী জানেন? বাংলাপিডিয়া বলছে চারটি, এর বাইরে আরো দুই ইছামতীর খোঁজ আছে। অর্থাৎ মোট ছয় ইছামতী বাংলাদেশে। জাফরগঞ্জের দক্ষিণে হুরাসাগর-এর মোহনার বিপরীত দিকে নাথপুর ফ্যাক্টরির কাছ থেকে উৎপন্ন হয়ে মুন্সিগঞ্জের কাছে যোগিনীঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত এক ইছামতী। এ নদী একসময়ে পশ্চিম ঢাকার প্রধানতম নদী হিসেবে পরিচিত ছিলো। এই ইছামতীর তীরে রয়েছে কয়েকটি তীর্থঘাট- আগলা, সোলপুর, বারুণীঘাট, যোগিনীঘাট। ওদিকে আবার কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার উত্তর-পশ্চিমে রায়তার কাছে গঙ্গা নদী থেকে বের হয়ে প্রথমে পশ্চিমে এবং পরে দক্ষিণে বেঁকে গিয়ে কুষ্টিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীটি ইছামতী নামে পরিচিত। দর্শনার কাছে ভারতে প্রবেশ করে পরে বাংলাদেশ-ভারত সীমারেখা বরাবর দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা উপজেলার কাছে এ নদী কালিন্দী নাম ধারণ করেছে এবং হাড়িয়াভাঙ্গা নামে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। উত্তরের দিনাজপুরেও রয়েছে ইছামতী নদী। তবে বর্তমানে ওই এলাকায় এটি তুলসীগঙ্গা নামে পরিচিত। জেমস রেনেল তাঁর মানচিত্রে যেভাবে নদীটিকে এঁকেছেন তাতে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, ঢাকার ইছামতী ও দিনাজপুরের ইছামতী অভিন্ন। চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়াতে কর্ণফুলি নদীর একটি উপনদীর নামও যে ইছামতী। এছাড়া বগুড়া আর পাবনাতেও পাবেন আরো দুই ইছামতী নদী।

ইটনা হলো কিশোরগঞ্জের একটি উপজেলার নাম। কিন্তু ইতনা নামে গ্রাম ও ইউনিয়ন আছে নড়াইলে। ওপার বাংলার হাবড়ার একটি স্থানের নাম আবার ইতনা কলোনি। সেখানে বানিপুরে রয়েছে ইতনা মার্কেট।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক যশোর রোডে বাংলাদেশ সীমান্তেই থেমে যায়নি। বেনাপোল-হরিদাসপুর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বনগাঁর বুক চিরে সোজা চলে গেছে একেবারে কলকাতা পর্যন্ত।

দক্ষিণ কলকাতার নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন ও যশোরের কালেক্টরেট পার্ক

এবার ওপারের গল্প। কলকাতার দক্ষিণে গড়িয়া থেকে ক্যানিংয়ের রাস্তা ধরে এগোলেই পাবেন নরেন্দ্রপুর নামীয় এক নতুন উপশহ‌র। কিন্তু এপারের যশোর সদর উপজেলায় একটি ইউনিয়নের নাম নরেন্দ্রপুর। দক্ষিণকলকাতায় ঢাকু‌রিয়া এলাকাটা ব‌র্ধিষ্ণু, এদিকে যশোরের ম‌নিরামপুর উপজেলায় রয়েছে আরেক ঢাকুরিয়া গ্রাম।

পশ্চিমবাংলার উত্তর চব্বিশ পরগণার যে অংশটি কলকাতা মেট্রোসিটির আওতায় পড়েছে, সেখানে কসবা-তপসিয়া বিধানসভা কেন্দ্রের একটা পাড়ার নাম কুষ্টিয়া রোড। ওই পাড়ার এক সড়কের নাম কুষ্টিয়া মসজিদ বাড়ি লেন। শোনা যায়, সেখানকার বর্তমান অধিবাসীদের বাবা ও দাদুর প্রজন্মের আদি নিবাস অবিভক্ত বাংলার কুষ্টিয়া-নদীয়া জেলায় ছিলো। আবার নদীয়া জেলার তেহট্ট এলাকায় পাওয়া যায় আরেক কুশতিয়ার সন্ধান। জলঙ্গী নদীর ধারে এই জনপদ অবশ্য কুষ্টিয়া নয়, কুশতিয়া। আরো আছে। পশ্চিমবাংলার বাঁকুড়া জেলায় আছে আরেক কুশতিয়া। এর কাছ দিয়ে বয়ে গেছে দ্বারকেশ্বর নদী। বাংলা বানানে কুষ্টিয়া আর কুশতিয়া আলাদা হলেও ইংরেজি বানানে কোনো তফাৎ নেই।

আমাদের উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর জেলার সীমান্তের ঠিক ওপারেই পশ্চিমবাংলার এলাকাটির নামও দিনাজপুর। তবে ১৯৯২ সালে ওপারের দিনাজপুর ভাগ করে উত্তর দিনাজপুর ও দক্ষিণ দিনাজপুর নামে দুটো জেলা তৈরি হয়।

ভারতের কাশ্মিরের রাজধানী শ্রীনগর হলেও এই নামে কিন্তু আমাদের মুন্সীগঞ্জ জেলায় একটি উপজেলাও আছে।

ঐতিহ্যবাহী নেপালি টুপি ও ঢাকাই জামদানির উৎপাদন প্রক্রিয়া

আর নেপালী টু‌পি ব‌লে আমরা যাকে জা‌নি, তার আসল নাম তো ঢাকা টু‌পি। কীভাবে নেপালী টুপির নাম হলো ঢাকা টুপি? প্রচলিত আছে তিনটি মতবাদ। প্রথম মতানুসারীরা মনে করেন, মাথা ঢাকা থাকে বলেই এর নাম ঢাকা টুপি। তবে দ্বিতীয় মতবাদ তথা ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, নেপাল রাজতন্ত্রের ক্ষমতা যখন শাহ বংশের কাছ থেকে রানা বংশ গ্রহণ করে, সেই আমলে অর্থাৎ ঊনিশ শতকের শুরুর দিকে কোনো এক প্রতাপশালী রানা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় আসেন। তিনি ঢাকাই জামদানির নকশায় মুগ্ধ হয়ে ওই নকশা করা টুপি কার্যাদেশ দিয়ে বানিয়ে নিয়ে যান নেপালে। তারপর নেপালী কারিগরেরা ওই নকশা আত্মস্থ করে বানানো শুরু করে তাদের টুপি। তাই এর নাম ঢাকা টুপি।

আবার তৃতীয় আরেকটি মতানুসারে, ঢাকাই জামদানির নকশা জনপ্রিয় ছিলো ভারতেরও বিভিন্ন স্থানে। ভারতেরই কোনো এক তাঁত কারখানায় নেপালী এক কারিগর কাজ করতে গিয়ে ঢাকাই জামদানির নকশা তৈরি আত্মস্থ করে। পরে তিনি অনুরূপ তাঁত ও সুতা নিয়ে নিজের দেশে গিয়ে স্থাপন করে ঢাকাই জামদানির নকশায় নিজেদের টুপি বুনতে শুরু করেন। কালক্রমে ওই টুপিই হয়ে দাঁড়ায় নেপালের জাতীয় ঐতিহ্য। এ বিষয়ে নানা মত থাকলেও ঐতিহাসিক সব তথ্য সমর্থন করে ঢাকাই জামদানির নেপাল জয়ের কাহিনীই। অর্থাৎ, আমাদের ঢাকা চলে যায় নেপালেও।

#সংবাদ২৪/এমকে

বিজ্ঞাপন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
Loading...
DMCA.com Protection Status